আজ পবিত্র আশুরা এই দিনে ঘটে যাওয়া আরও কিছু ঘটনা

0
294

জসিম ভুঁইয়া ,সময় সংবাদ বিডি –

ঢাকাঃ শান্তা মারিয়া ‘মহরমের চাঁদ এল ঐ/কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়/হায় হোসেন হায় হোসেন/তারই মাতম শোনা যায়/কাঁদিয়া জয়নুল আবেদীন বেহুঁশ হলেন কারবালায়/বেহেস্তে লুটিয়া কাঁদে আলি ও মা ফাতেমায়।’ ইসলামের ইতিহাসে মহরম- একটি শোকাবহ দিন। এই দিনে বর্তমান ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স) এর নাতি ইমাম হোসেন ইবনে আলি এবং উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইমাম হোসেনের সাথি ছিলেন তার অল্পসংখ্যক সমর্থক ও আত্মীয়। অন্যদিকে ইয়াজিদের ছিল বিশাল সেনাবাহিনী।

এই অসমযুদ্ধে ইমাম হোসেন তার ছয় মাস বয়সী শিশুপুত্র আলি আল আসগর ইবনে হোসেনসহ ৭২ জন সঙ্গী শহীদ হন। নারী ও শিশুরা বন্দি হন।
এই মহরমকে আশুরা বলা হয়। ইসলামি মত অনুসারে আশুরা বিভিন্ন কারণে ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, মহরম এইদিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করা হয়েছিল।

এই দিন হজরত আদম (আ) কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনে হজরত মুসা (আ) এর শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এই দিন নুহ (আ.) এর কিস্তি ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিল। এদিনের আরও অনেক তাৎপর্য ইসলামি দর্শনের প-িত ব্যক্তিরা উল্লেখ করেন।

শিয়া মতাবলম্বীরা আশুরার দিনটিতে ইমাম হোসেনের শাহাদাত স্মরণে আনুষ্ঠানিকভাবে শোক পালন করেন থাকেন। এদিন মিছিল, মাতম ও শোকানুষ্ঠানের আয়োজন হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিয়াপ্রধান অঞ্চলে আশুরায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। বাংলাদেশের শিয়া মতাবলম্বীরা আশুরায় তাজিয়া মিছিল, মাতমসহ বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। ঢাকায় মহরমের আশুরা পালনের ইতিহাস বেশ পুরনো। মূলত মোগল আমলে ঢাকায় মহরমের আচার-অনুষ্ঠান পালন জোরেশোরে শুরু হয়।

মোগলদের মধ্যে শিয়া মতাবলম্বী অনেক অভিজাত ব্যক্তি ছিলেন। মোগল শাহজাদা শাহ সুজা নিজে ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী। তিনি ঢাকায় আসার সময় তিনশ অভিজাত শিয়া পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমলে শাহ সুজার সুবেদারির সময় ঢাকায় ইমামবাড়া বা হোসেনি দালান নির্মিত হয়।

ইমাম হোসেনের স্মরণে নির্মিত হোসেনি দালান পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এখানে শিয়া উপাসনালয় ও কবরস্থান রয়েছে। অবশ্য ঢাকার হোসেনি দালানের নির্মাণকাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। হোসেনি দালানে স্থাপিত একটি শিলালিপিতে এর নির্মাতা হিসেবে শাহ সুজার নৌ সেনাপতি মীর মুরাদের (১৬৪২ খ্রিস্টাব্দ) নাম রয়েছে। ইতিহাসবিদ এম হাসান দানির মতে, মীর মুরাদ এখানে ছোট আকারের ইমামবাড়া স্থাপন করেন। এটি ভেঙে গেলে ঢাকার নায়েবে নাজিমরা নতুনভাবে তা নির্মাণ করেন। ইতিহাসবিদ জেমস টেলর তার বইয়ে বলেন, ১৮৩২ সালেও আদি ইমামবাড়া টিকে ছিল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে তার সংস্কার হয়।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এটি বিধ্বস্ত হয়। ঢাকার নবাব খাজা আহসানউল্লাহ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে এটি সংস্কার করেন। ১৯৯৫ ও ২০১১ সালেও ইমামবাড়ার সংস্কার হয়েছে। ২০১৫ সালে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় বোমা হামলা হয়। সে হামলায় একজন নিহত ও শতাধিক আহত হন।

মোগল আমল থেকেই ঢাকায় আশুরার দিন তাজিয়া মিছিলের আয়োজন হতে থাকে। এটি ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। ঢাকার নায়েবে নাজিমরা ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী; তাই তারা জাঁকজমকপূর্ণ তাজিয়া মিছিলের আয়োজন করতেন। উনিশ শতকের প্রথম দিকে আলম মুসাওয়ার নামে এক শিল্পীর ছবিতে ঢাকার মহরম মিছিল মূর্ত হয়েছে।

প্রতিবছর আশুরার দিন এখান থেকে তাজিয়া মিছিল বের করেন শিয়া মতাবলম্বীরা। মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে আবার হোসেনি দালানেই ফিরে আসে। ঢাকায় মহরমের মেলাও ঐতিহ্যবাহী। দেশের অন্যান্য স্থানেও মহরমের মেলার ঐতিহ্য রয়েছে।

মধ্যযুগে কারবালার শোকাবহ ঘটনা স্মরণে অনেক মর্সিয়া রচিত হয়। অনেক পুঁথিতেও কারবালার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। পরে মীর মশারফ হোসেন বিষাদ-সিন্ধু গ্রন্থে কারবালার কাহিনি রূপায়িত করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম তার একাধিক গান ও কবিতায় কারবালার বিষাদময় কাহিনি তুলে ধরে  ছিলেন,তাই  প্রতিবছরের মতো এ বছরও বাংলাদেশে শিয়া মতাবলম্বীরা আশুরা পালন করছেন। কারবালা প্রান্তরের শোকাবহ ঘটনাকে স্মরণ করে পালন করছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here