শুক্রবার , ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
ব্রেকিং নিউজ

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট

Image result for আজ শোকাবহ ১৫ আগস্টস্টাফ রিপোর্টার,সময় সংবাদ বিডি- ঢাকাআজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালি জাতির শোকের দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ৪২ বছর আগে এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল চক্রান্তকারী কিছু সেনাসদস্য। ঘাতকেরা নারী এবং শিশুদেরও রেহাই দেয়নি।

সেদিনও ছিল শ্রাবণের দিন। কাঁদছিল আকাশ। বজ্রপাতগুলো যেন ছিল প্রকৃতির ধমক। বলছিল-অসহ্য অসহ্য অসহ্য প্রকৃতির বিচার বড়ই নির্মম; কাউকেই ছাড়া হবে না। রেহাই পাবে না কেহই।

তাইতো ইতোমধ্যে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুঁলেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ খুনি। একে একে ১৯ জনকে হত্যাকারী এসব খুনির ছয়জন এখন দেশছাড়া। ইচ্ছে করেও আসতে পারছে না দেশে। তাদের সম্পত্তি যেন খাচ্ছে শকুন-শিয়ালে।

এদের একজন মরে গেলেও পরজনম সম্পর্কে জ্ঞাত একমাত্র সৃষ্টিকর্তা- আল্লাহ। কেউ কি জানত দেশের বাইরে থেকে বেঁচে যাওয়া জাতির জনকের দুই কন্যার একজন শেখ হাসিনা হবেন বাংলাদেশের তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। কেউ কি বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধুর অপর কন্যা শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক বিপুল ভোটে জয় করবেন যুক্তরাজ্যের আসন। কিন্তু প্রকৃতির বিচার তা-ই; আর ইতিহাসও বলেই সেই কথাই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায়- ‘যখন ঈদের শাড়ি কেনার বয়স ছিল, তখন বাবা থাকতেন জেলে। আর পঁচাত্তরের হত্যাকান্ডের পর ঈদ আসেনি আমাদের জীবনে।’ এমন শোকাবহ পনের আগস্ট আজ। কলঙ্কিত এইদিনে শোকাচ্ছন্ন পুরো জাতি।

ইতিহাস বলছে, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সুবেহ সাদিকের সময় যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নিজ বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের বৃষ্টিতে ঘাতকরা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, তখন যে বৃষ্টি ঝরছিল, তা যেন ছিল প্রকৃতিরই অশ্রুপাত। ভেজা বাতাস কেঁদেছে সমগ্র বাংলায়।

ঘাতকদের উদ্যত অস্ত্রের সামনে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলাদেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিল শোকে আর অভাবিত ঘটনার আকস্মিকতায়। কাল থেকে কালান্তরে জ্বলবে এ শোকের আগুন। আজ পনেরো আগস্ট শোকার্দ্র বাণী পাঠের দিন, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী।

সেই কালো রাতে শহীদ হয়েছিলেন যারা : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে ঘাতকের হাতে নিহত হন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্নেল জামিল, সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক, প্রায় একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্তঃস  স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা চালিয়ে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় রেন্টু খানকে হত্যা করা হয়।

সমগ্র জাতিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় প্রস্তুত করেছিলেন। প্রেরণা দিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তাই চিরঞ্জীব তিনি এ জাতির চেতনায়। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন, এক মহান আদর্শের নাম। যে আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল গোটা দেশ।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনে দেশের সংবিধানও প্রণয়ন করিয়েছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শোষক আর শোষিতে বিভক্ত সেদিনের বিশ্ববাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন শোষিতের পক্ষে।

পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার যে ডাক দিয়েছিলেন তা অবিস্মরণীয়। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়- ‘…অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন/ তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল/ হৃদয়ে লাগিল দোলা/ জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা/ কে রোধে তাঁহার বজ্র কণ্ঠ বাণী?’/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শুনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি/ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’/ সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর গ্রেফতার হওয়ার আগে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রেখে যান, যা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে সে সময় দেশের বিভিন্ন বেতার থেকে প্রচারিত হয়। ওই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়।

এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তাকে বন্দি থাকতে হয় পাকিস্তানের কারাগারে। তারই আহ্বানে চলে মুক্তিযুদ্ধ। দেশমাতৃকার কথা বিবেচনায় এনে কোটি বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েন পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে। বন্দিকালে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে মৃত্যুর সকল ষড়যন্ত্র প্রায় সম্পন্ন ছিল। এক সময় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অস্বীকার (নীরবতা পালন) করা হয় যে দেশটিতে বঙ্গবন্ধু রয়েছেন।

কিন্তু সে সময় ইন্দিরা গান্ধী বলেন, বঙ্গবন্ধু ভারতে রয়েছেন। তখন পাকিস্তান বাধ্য হয় জানাতে যে আসলে বঙ্গবন্ধু রয়েছেন পাকিস্তানে। সবশেষে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে প্রাণপ্রিয় নেতাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। তিনি ভারত হয়ে আসেন বাংলাদেশে। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের এইদিনে তিনি প্রাণের চেয়ে প্রিয় বাংলাদেশে ফিরে আসতে সমর্থ হন। দেশে ফিরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে মন দেন বঙ্গবন্ধু।

সে সময় অনেক প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর রূপরেখায় তৈরি হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান। নবগঠিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের সাধারণ বাড়িটিতেই বসবাস করতেন।

কিন্তু থেমে থাকেনি মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র। পরাজয়ের শোধ নিতে তারা একের পর এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। এরই ফল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সে সময় সামরিক জান্তার অধীনের খুনিরা পুরস্কৃতও হয়েছিল নানাভাবে। এমনকি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার হত্যার বিচার ঠেকাতে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ও জারি করে খন্দকার মোশতাক সরকার।

 

Print Friendly