আর্তস্বাদের অতিসার

0
39

সময় সংবাদ বিডি

ঢাকাঃ সাদেক মিয়া একজন অসহায় দরিদ্র,বানের জলে ভেসে এসে হরিপুর গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। আপন জন বলতে তার বৌ ছাড়া আর কেউ নেই। বৌ সরলা বিবি,নামটি যেমন সরলা,তার কথা কাজে ও বাস্তব প্রমাণ মিলে।

সাদেক মিয়ার অভাবের সংসার, কোনো মতে খেয়ে না খেয়ে  মানুষের বাড়িতে কাজ করে করে মাথা রাখার মতো একখণ্ড জমি যদি সে কিনতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে সন্তানদেরকে নিয়ে বাস করতে পারবে এটাই সাদেক মিয়ার নিত্য দিনের স্বপ্ন।

সাদেক মিয়ার এখনো কোনো সন্তান হয়নি; মাস ছয়েক হয় সে বিয়ে করেছে। সাদেক মিয়ার আশা তার বৌ তাকে প্রথমে পুত্র সন্তান উপহার দিবে। কথায় বলে- প্রথম সন্তান বাপের ডান পাজর।

কিন্তু;বিধাতার লিখন খন্ডাবেকে? সাদেক মিয়ার সংসারে আগমন হলো এক নতুন অতিথির। এই অতিথি হলো তাদের প্রথম সন্তান। সাদেক মিয়া চেয়েছিল তার ছেলে হবে। কিন্তু তার আশা পূরণ হলো না। বিধাতা তাকে একটি মেয়ে দিলেন।

সাদেক মিয়ার বৌ কান্নাকাটি করতে লাগল। সাদেক মিয়া তার বৌ কে শান্তনা দিচ্ছে আর বলছে বৌ কান্নাকাটি করে কোনো লাভ নেই, সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। আল্লাহ আমাদেরকে মেয়ে  দিছেন পরের বার হয়তো হয়তো ছেলে দিবেন। সবই তাঁর লীলা খেলা।

সাদেক মিয়ার কথা শুনে সরলা বিবি কান্না থামিয়ে সাদেক মিয়াকে বলতে লাগল এবার মেয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে পরের বার আল্লাহ আমাদেরকে ছেলে দিবেন। সাদেক মিয়া- তাই যেন হয় বৌ।

আচ্ছা,তুমি এখন মেয়েকে নিয়ে থাক। সেলিমের বাপে আমারে ডাকছে গিয়ে দেখে আসি। সাদেক মিয়া চলে যায় সেলিমদের বাড়িতে। কুদ্দুস চাচা ও কুদ্দুস চাচা আমারে ডাকছেন? ও সাদেক মিয়া শুনেছি তোমার নাকি মেয়ে হয়েছে? ও কুদ্দুস চাচা। আহা রে…!

শোন সাদেক মিয়া কিছু করার নেই, সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। ও কুদ্দুস চাচা। সাদেক মিয়া তোমারে ডাকছি যে জন্যে – আমি ব্যবসার কাজে তিন সপ্তাহের জন্য শহরে যাচ্ছি। তোমার চাচী আর সেলিম বাড়িতে থাকবে, তাদের যা দরকার হয় এনে দিও। আচ্ছা কুদ্দুস চাচা এসবের জন্য সমস্যা হবেনা।কুদ্দুস মিয়ার পতিত বাড়ির একপাশে সাদেক মিয়ার ঘর। সাদেক মিয়া মনে মনে ভাবে আর কতদিন সে এভাবে মানুষের বাড়িতে থাকবে। তবে কুদ্দুস চাচা ভালো মানুষ, সে কিছু  বলবে না।কিন্তু নিজের বিবেক থাকতে হবে। সাদেক মিয়া দিনরাত মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার খরচ কমিয়ে কিছু টাকা জমা করে জমি কিনার জন্য।

সাদেক মিয়া ভাবে সংসার ছোট থাকতে  যে করেই হোক বাড়ির জন্য একখণ্ড জমি কিনতেই হবে। সংসার বড় হয়ে গেলে তা আর সম্ভব হবেনা। সংসারের খরচ বাড়লে যেটুকু রোজি করি সব সংসারের জন্য প্রতিদিন খরচ হয়ে যাবে। যে করেই হোক তার নিজের বাড়ি চাই। সাদেক মিয়া রাতকে দিন আর দিনকে রাত করে কঠোর পরিশ্রম করে। শরীর নিপাত যাক, যাতে তার সন্তানদেরকে কেউ ভাসাইন্না বলতে না পারে। তাই সে একটি বাড়ির মালিক হওয়ার জন্য নিজেকে শপে দিয়েছে পরিশ্রমের অথৈ গভীরে। কথায় আছে পরিশ্রম সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। তবে কতটুকু পরিশ্রমী হলে ভাগ্যের পরিবর্তন হয় তা আমার জানা নেই। সাদেক মিয়া হয়তো তারচেয়ে বেশি পরিশ্রম করে। আল্লাহ তার ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেন।

এভাবে কুদ্দুস মিয়ার বাড়িতে থেকে থেকে সাদেক মিয়া  একখণ্ড জমি কিনে নেয়। তার সাথে জন্ম হলো আরেক সন্তানের। পুত্র সন্তান হলো না বলে সাদেক মিয়ার মুখ এবার একটু মলিন। তবে কি আর করবে সবই যে বিধির খেলা। সাদেক মিয়ার বৌ সরলা বিবি চিন্তায় একেবারে ভেঙে পরছে। তবে সন্তানকে তো আর ফেলে দিতে পারবেনা।

সরলা বিবি সাদেক মিয়াকে বলতে লাগল আর কোন সন্তানের দরকার নেই! দুটি মেয়ে হয়েছে এই দুটিকে বড় করে বিয়ে দিতে হলেও অনেক টাকার প্রয়োজন। কিন্তু সাদেক মিয়ার ইচ্ছা বৃদ্ধবয়সে যাতে মাথা রাখার আশ্রয় মিলে তার জন্য তাদের একটি পুত্র সন্তান খুবই দরকার। আর মরার পরে যাতে কবরে মাটি দিতে পারে,মাঝে মাঝে হলেও কবরের পাশে দাড়িয়ে কোরআন পড়ে দোয়া করতে পারে তার জন্য পৃথিবীর বুকে একটি পুত্র রেখে যাওয়া খুবই প্রয়োজন।

চার সদস্য নিয়ে সাদেক মিয়ার সংসার মোটামুটি ভালোই চলছে। সাদেক মিয়া যে জমিটুকু কিনেছিল সেখানে ছোট একটি ঘর বানিয়ে বৌ বাচ্চাদের নিয়ে বাস করছে।এভাবে কেটে গেল আরো দুটি বছর।সরলা বিবি তৃতীয় সন্তান সম্ভবা।

একদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, সাদেক মিয়ার বাড়িটি ছিল গ্রাম হতে একটু দূরে, নতুন বাড়ি কেউ বেশি আসা-যাওয়া করেনা। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে সে দিন পরিবার পরিকল্পনার কর্মী ফাহমিদা আপু গিয়ে উঠলেন সাদেক মিয়ার বাড়িতে। অনেক্ষণ বসে তিনি তাদের সবকথা শুনলেন এবং তাদেরকে কিছু পরামর্শ দিলেন…। সাদেক মিয়া এর আগে ফাহমিদা আপুকে দু’চোখে দেখতে পারতো না। সাদেক মিয়া একটু হুজুগে ধরনের মানুষ। ফাহমিদা আপুর সাথে অনেক্ষণ কথা বলে তার চিন্তা চেতনার একটু পরিবর্তন হয়েছে। এখন সে কিছুটা হলেও বুঝতে পারছে।

শোনেন সাদেক ভাই আমাদের সমাজে মন্দ দেখার জন্য অনেক লোক পাবেন কিন্তু ভালো দিকটা বলে দেওয়ার জন্য লোক খুঁজে পাবেন না। আপনি শীঘ্রই ভাবীকে নিয়ে  ডাক্তারের কাছে যান।ফাহমিদা আপু মা ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফারজানা ইয়াসমিনের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে চলে আসলেন।

এতক্ষণে বৃষ্টি থেমে আকাশে সূর্যি (☀)  মামা হাসি দিয়েছে। ফাহমিদা আপুর কথামত সাদেক মিয়া তার বৌকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার পরিক্ষা নিরীক্ষা করে জানালেন- সরলা বিবির গর্ভে মেয়ে সন্তান। যদি সন্তানটিকে নষ্ট করতে হয় তাহলে অ্যাবরশন করতে হবে।
কিন্তু ডাক্তাররা অ্যাবরশন করতে রাজি না,তবুও মাঝে মাঝে  সমাজের খারাপ চরিত্রের কিছু মানুষের কারণে বাধ্য হয়ে তাদেরকে অ্যাবরশন করতে হয়।

সরলা বিবি রাজি হলেও সাদেক মিয়া রাজি হলো না। কে বহন করবে এই মানব শিশু হত্যার পাপ,তারপর আবার নিজের সন্তান। এটি ও আল্লাহর একটি পরিক্ষা। যা হবার তাই হবে,সাদেক মিয়া চলে আসলো  ডাক্তারের কাছ থেকে। মাস দু’এক যেতেই জন্ম হলো সাদেক মিয়ার তৃতীয় মেয়ে সন্তানের। টুকটুকে সুন্দর একটি মেয়ে সাদেক মিয়া তার প্রথম মেয়ের নাম রেখেছিল প্রীতি, দ্বিতীয় মেয়ের নাম স্মৃতি, এবার সাদেক মিয়া ভাবলো আর সন্তান নিবে না, তাই তৃতীয় মেয়ের নাম রাখলো ইতি।

এদিকে সাদেক মিয়ার জীবনে আসতে লাগল আরেক কালবৈশাখী ঝড়। সাদেক মিয়া হাড়ভাঙ্গা কষ্টের ফলে মাথা রাখার জন্য  যে জমিটুকু কিনেছিল তার উপরে পরলো গ্রামের মাতব্বর হুকুম আলির শকুন চোখের দৃষ্টি…।

সাদেক মিয়াকে যে করেই হোক সে বাড়ি ছাড়া করে সাদেক মিয়ার বাড়িটি দখল করবেই করবে। হুকুম আলির কাছ থেকে ই এ পরিত্যাক্ত জমিটুকু কিনে অনেক কষ্টে সেখানে ছোট একটি ঘর বানিয়ে বৌ বাচ্চাদের নিয়ে বাস করছিল সাদেক মিয়া। ছোট কালেই মা-বাবাকে হারিয়ে সমাজের মানুষের অবহেলার পাত্র হয়ে বড় হয়েছে সাদেক মিয়া। সম্ভবত প্রাথমিক পাশ করেছিল। তাই তার জমি জমার দলিল সংক্রান্ত কোনো জ্ঞান ছিল না। হুকুম আলির কাছ থেকে জমি কিনার সময় হুকুম আলি জমির আসল দলিল না দিয়ে নকল দলিল দিয়েছিল। কিন্তু সাদেক মিয়া তা জানতো না।দলিলে লেখা ছিল- দশ বছরের জন্য একলক্ষ দশ হাজার টাকা দিয়ে সাদেক মিয়াকে জমিটুকু বন্দোবস্ত  দিলাম।সাদেক মিয়ার বাড়িটা অনেক সুন্দর হয়েছিল বড় অঙ্কের টাকায় বিক্রি করা যাবে তাই হুকুম আলি এসে বসলো সাদেক মিয়ার ঘাড়ে। হুকুম আলি যে সাদেক মিয়ার সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা হয়তো সে কোনোদিন কল্পনা ও করেনি। সাদেক মিয়া সালিশ বসাল, কিন্তু কে বলবে মাতব্বরের উপরে কথা, কে আছে তার আপনজন? বারবার সালিশ বসিয়ে ও কোনো লাভ হলো না সাদেক মিয়ার।

সাদেক মিয়া বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে না,কিভাবে সাদেক মিয়াকে বাড়ি ছাড়ানো যায় তা হুকুম আলির অতিসারে পরিণত হলো।অতিসার হলে যেমন শান্তি মিলে না ঠিক তেমনি যতক্ষণ না সাদেক মিয়াকে বাড়ি ছাড়া করতে পারছে  হুকুম  আলির মনে শান্তি আসবে না।

এদিকে সাদেক মিয়া সন্তান নিবে না বলে যে শপথ  করেছিল তা ভঙ্গ করে, পুত্র সন্তানের আশায় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে আরেকটা সন্তান নিল।ডাক্তার পরিক্ষা করে বলে দিয়েছেন এবার তার পুত্র সন্তান হবে। সাদেক মিয়া খুব খুশি হলো।

একদিন সাদেক মিয়ার বাড়িতে হুকুম আলি গিয়ে  সাদেক মিয়াকে না পেয়ে সরলা বিবির কাছে বলল। দু’দিনের মাঝে যেন তারা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এ কথা শুনে সরলা বিবি হুকুম আলিকে অনেক খারাপ গালি দেয়।
সরলা বিবির গালি শুনে হুকুম আলি রেগে গিয়ে তাকে গলাধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে চলে আসে।সরলা বিবি সাদেক মিয়ার কাছে এসব কিছুই বলেনি,বাচ্চাদেরকেও না বলতে নিষেধ করেছে। সাপ্তা কানেক পর সরলা বিবির মৃত পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। সরলা বিবি ও মারা যায়। সাদেক মিয়ার ভাগ্যে নেমে আসে কষ্টের ভীবিষীকাময় অন্ধকার। সাদেক মিয়াকে বাড়ি ছাড়া করে হুকুম আলি। জমি বিক্রির কথা বলে বন্দোবস্তের নকল দলিল দিয়ে সাদেক মিয়াকে ঠকিয়ে আবার বাড়ির মালিক হলো মাতব্বর  হুকুম আলি। ধ্বংস করে দিলো সাদেক মিয়ার সাজানো স্বপ্নের সংসার। সাদেক মিয়া তিন মেয়েকে নিয়ে আবার ফিরে গেল কুদ্দুস মিয়ার বাড়িতে। আজও সে কুদ্দুস মিয়ার বাড়িতে আছে। এখানেই হয়তো সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে। অসহায় হয়ে যাবে তার তিনটি মেয়ে।

এম.এ.কাওছার মুরাদ ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here