কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে ভেন্না গাছ

0
58

নুরনবী সরকার, নিজস্ব প্রতিবেদক, কুড়িগ্রাম:
“আসমানিদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুল পুরে যাও। বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি, একটুখানি বৃষ্টি হলে গড়িয়ে পড়ে পানি।” পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের লেখা এই কবিতার সাথে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। ছোট-বড় অনেকেরই মুখে এই কবিতাটি শোনা যায়। কিন্তু, কবিতায় ব্যবহৃত ভেন্না পাতার গাছটি আমাদের অনেকেরই অজানা। জানবেই বা কি করে? কালের বিবর্তনে তো প্রাচীন বাংলার অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদে ভরপুর ছিল এই গ্রাম বাংলার পথ-ঘাট, লোকালয় থেকে প্রান্তর। এক সময় নানা রঙের উদ্ভিদের সমাহার ছিল এই রুপসী গ্রাম বাংলায়। কিন্তু সেই সমাহার আর আগের মত দেখা যায় না। আস্তে আস্তে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে। নির্বিচারে বনঝাড় উজার করণ, আবাসস্থল তৈরী আর আবাদী জমিতে পরিনত করাই হচ্ছে বিলুপ্তির বড় কারণ। বাংলাদেশের গ্রাম ও গঞ্জের আনাচে কানাচে পাওয়া যেত নানা ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ কিন্তু এখন এসবের সংখ্যা অতি নগন্য।

তাদের অন্যতম হচ্ছে ভেরেন্ডা বা ভেন্না। এই ভেরেন্ডাকে আমাদের গ্রাম্যভাষায় বলা হয় হ্যান্ডা। আমাদের দেশে ভোজ্যতেলের তালিকা ভেরেন্ডা একটি পরিচিত নাম। কিছুদিন আগেও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বনজঙ্গল, ঝোপঝাড় ও বাড়ীঘরের আনাচে কানাচে প্রচুর পরিমানে ভেরেন্ডা গাছ দেখতে পাওয়া যেত। কালের আবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ভেরেন্ডা গাছ।

ভোজ্য তেল হিসেবে এর অনেক কদর ছিল। ভেরেন্ডার তেল আমাদের দেশে গবীর মানুষের ভোজ্যতেল। ভেরেন্ডা গাছ দেখতে অনেকটা পেঁপে গাছের মত। ভেরেন্ডা গাছ ১০-১৫ ফুট লম্ব হয়। সবচেয়ে বড়পাতা উদ্ভিদগুলোর মধ্যেও একটি। গজানের সময় কোন শাখা প্রশাখা থাকে না আর একটু বড় হলে শাখা প্রশাখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই গাছ বর্ষাকালে বিনা চাষেই গজায়। গ্রামবাংলা আনাচে কানাচে ও ঝাপ ঝাড়ে এবং হেমন্ত ও শীতকালে ফুল ও ফল ধরা শুরু করে। অনুকূল পরিবেশে সারা বছরেই ফুল ও ফল ধরে।

ভেরেন্ডা গাছগুলো সাদা, কালো ও লালচে বর্ণের হয়ে থাকে। গিটযুক্ত গাছের পাতায় ৮-১০টি কোনা যুক্ত পাতা মানুষের হাতে মত ছাড়ানো থাকে। পাতাগুলো ৬-৮ ইঞ্চি পযর্ন্ত লম্বা হয়। গাছের বয়স ২-৩ মাস হলেই শাখায় শাখায় ফুলের কাঁদি হয়। প্রতিটি কাঁদিতে দেড় থেকে দুই শতাধিক ফল ধরে। প্রতিটি ফলে ৩-৪ টি দানা বীজ হয়। কাঁদিগুলো পাকধরণে হাল্কা কালচে বর্ণের হয়ে থাকে। তখন গাছ থেকে কাঁদিসহ ফল ছড়িয়ে নিয়ে রোধ শুকিয়া বীজ সংগ্রহ করা হয়। বীজগুলো রোধ শুকিয়ে সরিষা অথবা তিল তিসির সাথে মিশিয়ে মেশিনে ভাঙ্গিয়ে ভোজ্য তেল তৈরি করা হয়।

ভেরেন্ডা তেলের অনেক উপকারীতা রয়েছে। গরম ভাতের সাথে খেলে রুচিবারে। ভেরেন্ডার তেল দিয়ে তরকারী রান্না আর পিঠা তৈরীতে ব্যবহার করা হয়। এই তেল নিয়মিত ব্যবহার করলে মাখা ঠান্ডা রাখে। আগুনের পোড়া দাগ মেশাতে এ তেল বিশেষ কার্যকরী। মাছ ধরার জন্য অথবা কৃষি কাজের প্রয়োজনে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর বা ডোবায় বা লালায় নোংরা পচা পানিতে নামার আগে ভেরেন্ডাতে শরীরে মেখে নিলে শরীর চুলকায় না অথবা জোঁক ধরে না। কাঁচা বীজ কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দুর করতে বিশেষ কার্যকরী। প্রচন্ড ঠান্ডা লাগলেও এ তেল গরম বুকে মালিশ করলেও আরাম পাওয়া যায়। এ তেল সারাশরীরে মাখলে ত্বক ভালো থাকে। ৫০০ গ্রাম ভেরেন্ডা ফল থেকে ১ কেজি তেল পাওয়া য়ায়।

আমাদের উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকার মাটি ভেরেন্ডা চাষের জন্য উপযোগী। এ অঞ্চলের ভেরেন্ডা চাষে উজ্বল সম্ভবনা থাকা স্বর্তেও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এ অঞ্চল থাকা ভেরেন্ডা হারিয়ে যেতে বসেছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here