ছায়াসঙ্গী: ‘আমার বোনটা কই? রেহানা কই?’ 

0
370

জাহিদ বিন আজিজ

সময় সংবাদ বিডি ঢাকা

অক্সফোর্ড লন্ডন। শেখ হাসিনার ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ দর্শন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন। প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে দর্শকের সারিতে বসে আছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠান শেষ হবার পর শেখ হাসিনা মঞ্চ থেকে নামলেন। আয়োজকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্পগুজব করছেন। তাঁকে ঘিরে আছে লন্ডন আওয়ামী লীগের নেতারা। হঠাৎ শেখ হাসিনা বল্লেন ‘আমার বোনটা কই? রেহানা কই?’ এদিকে ওদিকে খোঁজাখুজি শুরু হলো। আয়োজকদের একজন জানালেন ‘ছোট আপা বোধহয় চলে গেছেন’। শেখ হাসিনা বললেন ‘অসম্ভব’। এক মুহূর্তেই অন্য এক জটলা থেকে বেরিয়ে এলেন শেখ রেহানা। এসে বোনের হাতটা ধরলেন। শেখ হাসিনা বললেন ‘সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে ও কোনোদিন যাবে না’। বলেই আদরের ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরলেন। শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে। শেখ হাসিনার ছোট বোন। একজন রত্মগর্ভা মা। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে তিনি এক অসীম ভরসাস্থল। সারা বাংলাদেশ তাকিয়ে থাকে শেখ হাসিনার ওপর। সারা বাংলাদেশের আশা ভরসাস্থল শেখ হাসিনা। আর শেখ হাসিনার ভরসাস্থল হলেন শেখ রেহানা। সারাদিনের সব ঝক্কি, ক্লান্তি, রাগ, বিরক্তি, হতাশার পর যখন লন্ডন থেকে একটা শব্ধ শোনেন ‘বুবু’। সঙ্গে সঙ্গে সব ক্লান্তি যেন উবে যায়, পরম প্রশান্তিতে শেখ হাসিনা যেন ভেসে যান। শেখ হাসিনার সত্যিকারের বন্ধু, উপদেষ্টা, শুভার্থীর নাম শেখ রেহানা। শেখ হাসিনার সাহস, শেখ হাসিনার প্রেরণার নাম শেখ রেহানা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনাকে নিয়ে যত চর্চা হয়, ততটাই আড়ালে থাকেন শেখ রেহানা। কিন্তু শেখ হাসিনা নিজেই অকপটে বলেন ‘আমি আজকের এই অবস্থায় এসেছি বাবা-মায়ের দোয়া আর বোন শেখ রেহানার সহযোগিতায়’। নেপথ্যে থাকতেই তিনি পছন্দ করেন। আওয়ামী লীগের যে কোনো পদ যখন তখন তিনি নিতে পারতেন। মন্ত্রী এমপি হওয়া তাঁর জন্য ছিল শুধু একটা হ্যাঁ বলার বিষয়। কিন্তু তিনি সে পথে যাননি। লন্ডনে বাসে চড়ে অফিস করেছেন। ছোট বাসায় অনেক কষ্টে ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছেন। তার বড় ছেলে ববির মেধা নিয়ে দেশে বিদেশে চর্চা হয়। এসময়ের ‘জিনিয়াস’ খ্যাতি পেয়েছেন ববি। টিউলিপ তো এখন বিশ্ব রাজনীতির তরুণ বিস্ময়। দু’দুবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এমপি হলেন। আর ছোট মেয়ে রপন্তী অক্সফোর্ডের মেধাবী মুখ। বিত্ত বৈভবকে পায়ে ঠেলে সন্তানদের জন্য বেছে নিয়েছেন কষ্টের পথ। অথচ, পরিবারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে আদরের। সবচেয় জেদী। বাবার কাছে বায়না ধরতেন সবথেকে বেশী। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার সময় কেবল মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন। তারপর থেকে সারাটা জীবন এক কষ্টের জীবন পার করেছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারটাই ছিল তাঁর বড় আকাঙ্খা। আর ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ। সে স্বপ্ন পূরণে বড় বোনকে সাহায্য করেছেন উজাড় করে। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে এসেই এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। এসময় তাঁর পাশে থেকে তাঁকে সাহস দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন শেখ রেহানা। সংসারে দুই বোনের মিল অনেকই থাকে, ঝগড়াও হয়। কিন্তু শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা যেন দুই শরীর এক আত্মা। ১৯৯১ এর নির্বাচনের পর ২০০১ এর বিপর্যয়ের পর কিংবা ২০০৪ এর গ্রেনেড হামলার সময় শেখ রেহানা যে ভূমিকা রেখেছেন, তা অনন্য। শেখ রেহানা পাশে না থাকলে, এক সময় বিরক্ত, হতাশ হয়ে হয়তো শেখ হাসিনা রাজনীতিই ছেড়ে দিতেন। অনেক স্বল্পভাষী। কিন্তু মানুষকে চিনতে পারেন খুব ভালো। এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়, শেখ হাসিনা হয়তো কাউকে বিশ্বাস করে অনেক দায়িত্ব দিলেন। শেখ রেহানা বললেন, ‘বুবু’ ঠিক ঠাক খোঁজ নিয়েছো তো? কিংবা শেখ হাসিনা কাউকে পছন্দ করছেন না, শেখ রেহানা বললেন ‘বুবু, মানুষটা কিন্তু দলের জন্য নিবেদিত’। প্রায় সবক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ছোট বোন ঠিক। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে, তাই ছোট বোনের পরামর্শ নেন। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় দুই বোনে মিলটাই বেশী। দেশে এলে এখন অনেকটাই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন ছোটবোন। বড়টা ঠিকমতো খায় না, বিশ্রাম নেয় না। মাঝে মাঝে ধমক দিয়ে তাঁকে রুটিনে আনতে হয়। বঙ্গবন্ধুর জাতির পিতা হয়ে ওঠার পিছনে ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুনেছা মুজিব। আর শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়ক হবার পিছনে আছেন শেখ রেহানা। অথচ কোন দিন জাহির করেন নি। শুধু ওয়ান-ইলেভেনে চরম দুর্দিনে নেতাদের ফোন করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। বিচ্যুতদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, বুবু তাঁর জন্য কী করেছিল। যেমনটি বেগম মুজিব করেছিলেন আগরতলা মামলার সময়। আড়ালেই আলোকিত শেখ রেহানা। তিনি ছায়া হয়ে থাকতেই বেশী পছন্দ করেন। তাঁকে দেখলেই মনে হয় তিনি ছাড়া শেখ হাসিনা অসম্পূর্ণ। দুই বোন মিলেই যেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পূর্ণতা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here