পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘সাকরাইন এ উৎসব বরাবরের মতো এবারও রয়েছে ঘুড়িদের দখলে

0
291

জসিম ভুঁইয়া,সময় সংবাদ বিডি-

ঢাকাঃ পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এই উৎসব পালন করা হয়।এই দিন বাঙালিরা বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। পৌষের শেষের দিকে চলছে পুরান ঢাকার প্রাণের উৎসব সাকরাইনের কারণে আকাশ বরাবরের মতো এবারও রয়েছিলো ঘুড়িদের দখলে।

পৌষ মাসের শেষ দিন সাকরাইনে নতুন ধানের চালের পিঠাপুলি খেয়ে,ঘুড়ি উড়িয়ে আনন্দ উৎসব করার রেওয়াজ বহু পুরনো। ইতিহাস থেকে জানা যায় পুরান ঢাকা উৎসব হচ্ছে প্রায় ৪০০ বছর ধরে। বাংলাদেশের পুরনো ঢাকায় ঘুড়ি ওড়ানো বিনোদন শুরু হয়েছিল মুঘল আমলে। এটা বলা হয়ে থাকে,১৭৪০ সালে নবাব নাজিম মহম্মদ খাঁ এই ঘুড়ি উৎসবের সূচনা করেন,সেই থেকে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে।আদি ঢাকাইয়াদের ঐতিহ্যের সাকরাইন উৎসব। ভোরবেলা কুয়াশার আবছায়াতেই ছাদে ছাদে শুরু হয় ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। আকাশজুড়ে নানান রং আর বাহারের ঘুড়িদের আধিপত্য। গত এক সপ্তাহ ধরে পুরান ঢাকার বাহান্ন রাস্তা আর তেপান্ন গলির অধিকাংশ গলিতে আর খোলা ছাদে চলছে সুতা মাঞ্জা দেওয়ার ধুম। ছোটবড় সকলের অংশগ্রহণে মুখরিত প্রতিটি ছাদ।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে উৎসবের জৌলুস।আর শীতের বিকেলে ঘুড়ির কাটা-কাটি খেলায় উত্তাপ ছড়াবে সাকরাইন উৎসব। রোদে সুতা শুকানোর কাজও চলছে পুরোদমে। তাই শীতের উদাস দুপুর আর নরম বিকেলে আকাশে গোত্তা খাচ্ছে নানান রঙের ঘুড়ি। ঘুড়িতে ঘুড়িতে হৃদ্যতামূলক কাটা-কাটি খেলাও চলছে। অহরহ কাটা-কাটি খেলায় হেরে যাওয়া অভিমানী ঘুড়ি সুতার বাঁধন ছিঁড়ে ভাকাট্টা হয়ে যাচ্ছে দূরে।

সাকারাইন এ উৎসব এখন আর শুধু ঢাকাইয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাকরাইন পুরান ঢাকায় বসবাসকারী সকল মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে। আকাশে উড়বে ঘুড়ি আর বাতাসে দোলা জাগাবে গান। মাঝে মাঝে ঘুড়ি কেটে গেলে পরাজিত ঘুড়ির উদ্দেশ্যে ধ্বনিত হবে ভাকাট্টা লোট শব্দ যুগল। এ দিন পুরনো ঢাকার দয়াগঞ্জ, মুরগীটোলা, কাগজিটোলা, গেন্ডারিয়া, বাংলাবাজার, ধূপখোলা মাঠ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাঁখারী বাজার, সদরঘাট, কোটকাচারী এলাকার অধিবাসীরা সারা দিনব্যাপী রঙ বেরঙের ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতায় উৎসব পালন করেন আজ।

তাছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এ পৌষসংক্রান্তির এই উৎসব পালনের রীতি চালু আছে। নেপালে একে বলে মাঘি, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মিয়ানমারে থিং ইয়ান, কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান এবং ভারতে মকরসংক্রান্তি এবং পশ্চিম ভারতের গুজরাটেও পালিত হয়। উত্তর ভারতীয় এ ঘুড়ি উৎসবটিকে স্থানীয়রা ‘সাকরাইন’ নামে অভিহিত করে।

সেখানে মানুষ সুন্দর সুন্দর ঘুড়ির মাধ্যমে সূর্যদেবতার কাছে নিজেদের ইচ্ছা ও আকুতি প্রেরণ করেন। কিন্ত এক সময় আদি ঢাকাইয়াদের ঐতিহ্যের সাকরাইন উৎসবে,এক দশক আগেও ছাদে ছাদে থাকতো মাইকের আধিপত্য ছিলো।

আজ কালের পরিবর্তনে এখন আর মাইকের ব্যবহার নেই, মাইকের স্থান দখল করেছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। উৎসবের আমেজ থাকবে পুরান ঢাকার সর্বত্র। অতীতে সাকরাইনে পুরান ঢাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই,বাহারি ঘুড়ি উপহার দেওয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানো ছিলো অবশ্য পালনীয় অনুসঙ্গ।

ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হতো আত্নীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে। একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলতো কার শ্বশুরবাড়ি হতে কত বড় ডালা এসেছে। তার মধ্যে পিঠা খাওয়া, ঘুড়ি উড়ানো অন্যতম।আজ এই সব চমৎকার আচারগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে।

উল্লেখ্য যে,পুরান ঢাকার সার্বজনীন উৎসব ঈদ মিছিল, বৈশাখী মেলা আর সাকরাইন উৎসব। আশার কথা এই যে, পুরান ঢাকার ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবন, সংরক্ষণ এবং জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে বর্তমান প্রজন্ম ও সচেতন।

তাই পুরান ঢাকার আদি বসবাসকারী সকল মানুষ আজও এই ঐতিহ্যগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করেন তাদের নিজ মনে। সারাদিন ঘুড়ি উড়ানোব পরে সন্ধ্যায় পটকা ফুটিয়ে ফানুস উড়িয়ে এ উৎসবের সমাপ্তি করে।

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here