পুষ্পার সংগ্রাম

0
198

puspaসময় সংবাদ বিডি-ঢাকা: গ্রামরে এক সাধারণ গরিব চাষার মেয়ে পুষ্পা। দরিদ্রতার সঙ্গে যার বেড়ে ওটা। ছোট বেলায় মাকে হাঁরিয়ে বাবার কূলেই বড় হয়েছে ছোট এক খন্ড জমির উপর চাষাবাদ ও ফসল বিক্রি করে চলতো বাবা মেয়ের সংসার। বেড়ে ওঠতে পুষ্পাকে প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করতে হয়েছে দরিদ্র্যতা ও প্রতিকূলতার রিরুদ্ধে। মা হারা পুষ্পা বাবা মেয়ের সংসার ভালোই সামলিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্ত মেয়ে দিন দিন বড় হহচ্ছে, এ সিয়ে বাবার ভীষণ দুশ্চিন্তা, ভালো পাত্রের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়ে হয় তো শান্তিতে চিরনিদ্রায় সায়িত হতে চান, এ বলে এদিক ওদিক অনেক খোঁজাখুঁজির পর ভালো এক পাত্রের সন্ধান পেলেন। স্বভাব চরিত ভালো পাশের গ্রামেরেই মল্লিকের ছেলে অজয়। দু পরিবারের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হলো। তারপর বিয়ে।

অচেলা অজানা এক জীবনের সাথে পরিচিত হতে লাগলো  সে। দাম্পত্য জীবন পুষ্পা ও অজয়ের ভালোই কেটে যাচ্ছিলো। আয় সামান্য হলওে তাদের বেশ চলছিলো। বিয়ের এক বছরের মাথায়  তাদের ছোট ঘর আলোকিত করে নতুন অতিথির আগমন ঘটে। পুষ্পা এক মেয়ে সন্তানের জন্মদান করে। অজয় ভীষণ খুশি মেয়ের বাবা হয়েছে সে। কিন্তু মেয়ে শিশুর আগমনে স্বামী পরিবাররে অন্য সদস্যরা যে তেমন একটা খুশি নন তা তাদের চোখ মুখে ভেসে উঠছিলো। সহসাই তা বুঝতে পারলো পুষ্পা। তাই সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে সামনে হয়তো তাকে আরও বড় সংগ্রামরে মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।

এদিকে তিথি ধীরে ধীরে উ, আ, ই কথা বলতে শুরু করেছে। বাবা মা বেজায় খুশী। তারপর মেয়ে নিয়ে নানা ভাবনা, ভালো জায়গা, ভালো খাবার ও লেখাপড়া ইত্যাদির কথা। এভাবে অনেক দিন কেটে গেলো।

সামনরে ডিসম্বরে মাসেই তিন বছরে পা রাখবে আদরের তিথি। তাই মেয়েকে জন্মদিনে বাবা পুতুল উপহার দিবে বলে একদিন শহরের উদ্দেশ্য রওয়ানা করলো। শহরের এগলি ওগলি  খোঁজাখুঁজরি পর মেয়ের জন্য সুন্দর একটি পুতুল কিনলো সে। তারপর বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন, ঘটল র্মমান্তিক র্দুঘটনা, বিপরীত দিক থেকে আসা চলন্ত বাসের সাথে সরাসরি সংর্ঘষ। মুর্হূতের মধ্যইে অনকেগুলো তাজা প্রাণের ও গল্পের সমাপ্তি রেখা শেষ বিন্দুতে পৌছল। র্আতনাদ আর রক্তের ছড়াছড়ি চারপাশে।

মুর্হূতের মধ্যইে খবরটি ছড়িয়ে পড়লো র্সবত্র। খবরটি পুষ্পার কানে পৌঁছাবার পর, পৃথিবীটা জল শূন্য মরুভূমির ন্যায় মনে হচ্ছিলো তাঁর কাছে। হঠাৎ সে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। তারপর পাগলের বেশে বেরিয়ে পড়লো র্দুঘটনা কবলিত জায়গায়, এবং পাগলের মতো খুঁজতে লাগলো স্বামীকে এদিকে ওদিকে। হঠাৎ দেখতে পেলো বুকে পুতুল জড়িয়ে ধরা রক্তে লাল শরীর। দৌড়ে কাছে গেলো সে। মুখে কথা নেই, সমস্ত শরীর রক্তে লাল, শরীরের সব রক্ত বেরিয়ে জমাট বেধে আছে শরীরের পাশে। বুঝতে পারলো স্বামী এপারে আর নেই। মৃতদেহটিকে জড়িয়ে ধরে পুষ্পা বলতে শুরু করলো, ‘তিথি এটা বেশ পছন্দ করবে দেখো, সারাক্ষণ ঘর মাতাবে এটা নিয়ে, কথা বলবে, গল্প করবে ইত্যাদি বলে কাঁদতে শুরু করলো সে।

মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরলো সে। শেষ বিদায় অনুষ্ঠান সর্ম্পূণ হলো। ওমন অকালে তাঁর কপাল পুড়বে কে জানতো, হাতের মেহেদী না মুচতেই, তাজা গোলাপের গন্ধ না শেষ হতেই স্বামীর চিরবিদায়, চারিদিকে কোঁয়াশাচ্ছন্ন মনে হচ্ছিলো তার। মায়ের পড়নে সাদা শাড়ী, চারদিকে সবাই কাঁদছে, এ দেখে ছোট তিথি অবাক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু তিন বছরের তিথি আদৌ কি জানতো এ সাদা শাড়ী আর কান্নার র্অথ? তারপরও যেন কি বলতে চাচ্ছে উ আ করে, হয়তো বাবা কোথায় জানতে বা তাঁর কূলে উঠতে চায়। মেয়েকে জড়িয়ে পুষ্পা বলতে লাগলো, ‘মারে জন্মরে পর মাকে হারালাম, মায়ের স্বাদ না পেয়েই বড় হলাম, দারিদ্রতার সাথে বেড়ে উঠলাম, অকালে তোর বাবাকে হারালাম। ভাগ্যরে নিষ্ঠুরতা আমার গাঁয়ে মিশে আছে রে মা।’ ইত্যাদি বলে কাঁদতে লাগলো সে।

পুষ্পাকে প্রায়ই অলক্ষী, অভিশপ্ত বলে গালমন্দ করতো স্বামীর বাড়ির লোকেরা, অজয়ের অকাল মৃত্যুতে তাকেই দোষারোপ করতো বারবার। হঠাৎ একদনি তাগিয়েই দিলো তাকে। সব কূল হারা পুষ্পা জীবনের আর একটি অচেনা অধ্যায়ের সাথে পরিচিত হতে লাগলো। কি নিষ্ঠুর এ সমাজ, তার পক্ষে দু’কথা বলতে কেই এগিয়ে আসলো না। বাধ্য হয়ে কৃষক বাবার ভিটাতেই ফিরতে হলো ছোট তিথিকে সাথে করে। স্বামী সংসার সব হারা মেয়েটি ভাগ্যরে নির্মমতার কাছে আজ বড় অসহায়। কিন্তু সংগ্রামী পুষ্পা এতে সাহস হারালো না, নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজতে লাগলো। অসুস্থ বাবা আর তিন বছরের মেয়ের খাদ্য জোগাড় করাই প্রধান সংগ্রাম হয়ে দাঁড়ালো।

বাসায় বাসায় আয়ার কাজ করতে লাগলো সে, অসহায়  কাছে বাঁচার জন্য এটাই সহজ পন্থা মনে হলো। দিনে তিনটি বাসায় কাজ করতো আর রাতে বাবার সেবা ও মেয়ে যত্ন নিতো। কাজ থেকে যে টাকাকড়ি পেতো তা প্রয়োজনের চেয়ে ভীষণ অপ্রতুল ছিলো। বাবার ঔষধ, চাল, ডাল নিয়ে আসতেই হিমশিম খেয়ে যেতো। তারপরও বাবা ও মেয়ের কাছে এসে হাঁস্যউজ্জ্বল থাকতো সে। কিন্তু অসুস্থ বাবা মেয়ে চাঁপা হাসির আড়ালের কষ্টটুকু দেখতে পেতেন, কিন্তু শরীরের কাছে আজ তিনিও যে বড় অসহায়, নির্বাক। মেয়ের কষ্ট বুঝতে পারা সত্ত্বওে, অসহায়। রাতে চোখের অশ্রু ফেলে অভাগা মেয়ের জন্য কাঁদতেন আর বলতনে, ‘হায় খোদা একি হলো, হায় খোদা।’

ছমাস হয়ে গোলো সে আয়ার কাজ করছে, প্রতিমাসরে শেষেই বেতনের টাকায় লাল একটা পুতুল কিনবে মেয়ের জন্য চিন্তা করে কিন্তু বাবার দিন দিন বেশি ঔষধের প্রয়োজন পড়ছে, আগের চেয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন উনি। প্রতিদিনই ঔষধ নিতে হচ্ছে বলে, সে আর দু’জায়গায় কাজ করতে শুরু করছে, সকাল সন্ধ্যা পরিশ্রম করে যাচ্ছে বাবাকে সুস্থ করে তুলার জন্য।

বাবার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে পাড়ার এক ভদ্রলোক প্রায়ই বাড়িতে আসা যাওয়া করতেন, আর সঙ্গে তিথির জন্য খেলনা নিয়ে আসতেন। পুষ্পা উনার চালচরণ ও অঙ্গভঙ্গিতে আসল উদ্দশ্যে বুঝতে পারলো। অনেক সময় গাঁয়ে হাত দিয়ে কথা বলতো, এতে সে ভীষণ ভয় পেতো আর অসহায়ত্ব অনুভব করতো। কিন্তু কাকে বলবে সে, মাথার উপর কোন ছাঁয়া নেই যে ওর, অসহায়ের মতো নীরবে সহ্য করে যাচ্ছিলো। এদিকে নতুন যে দুবাসায় কাজ শুরু করছিলো, ঐ দুখানের মালকিদের আচরণও বেশ ভালো মনে হচ্ছিলান তার। কাজ না করলে অসুস্থ বাবা আর মেয়ে নিয়ে পড়বে চরম বিপাকে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে, মনের অনিচ্ছা সত্ত্বওে খারাপ আচরণ গুলো বহন করে যাচ্ছিলো। বেঁচে থাকার পথ ধীরে ধীরে সরু আর কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো তার। জন্মদুঃখী পুষ্পা নিজের দেহমনের সাথে সংগ্রাম করে করে অসহায় হয়ে পড়ছিলো। তাই ভয়ে কেঁদে কেঁদে নিজে অবচেতন মনকেই বলতে শুরু করলো, ‘স্বামী নেই, বাবা থেকেও নেই, অন্ধকার ও অনশ্চিতি ভবষ্যিতরে সামনে দাঁদিয়ে। হে খোদা, মনে আশা নেই তেমন, তবে চাওয়া একটি, স্বামীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাস নিয়ে যেনো মরতে পারি।

অনিশ্চয়তা আর ভয়ে কেটে গেলো আর দুটি মাস, ওদিকে তিথির মুখের কথা পরিস্কার হতে লাগলো। মেয়েকে যে বিদ্যলয়ে পড়তে পাঠাবে সে সার্মথ্য তাঁর নেই, কিন্তু বুকে ভীষণ আশা তাঁর মেয়েকে নিয়ে। ওদিকে বাসার মালকিদের আচরণ ক্রমেই জটিল হচ্ছিলো, তাই সে আয়ার কাজ ছেড় দিলো। দুমাস কাজ না করে খুঁজছিল বেঁচে থাকার অন্য কোন পথ। খুজেও পেলো সে,মজুররে কাজ, ব্রকিস ফল্ডি।

মজুররি কাজ করে করে মাও মেয়ের অন্য যোগিয়ে যাচ্ছিলো। তিথি বিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে থেকে ভালো লিখাপড়া করে যাচ্ছিলো। তিথি তাঁর মায়ের র্আদশে বড় হতে লাগলো। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়ে ভালো ফলাফল করে নানা মাধ্যমে বৃত্তি পেয়ে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা সর্ম্পূণ করে গ্রামে ফিরলো, মেয়ের কাছে। মেয়েকে এভাবে দেখে পুষ্পা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তিথি মাকে বললো, আমি পেরেছি মা! পুষ্পা নিরব, হঠাৎ বলে উঠলো, ‘আজকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিথি যদি সে দিন এভাবে থাকতো, বাবাকে অসহায় মৃত্যুবরণ দেখতে হতো না। জানিস তিথি নিজ কূলে তোর নানাকে মরতে দেখেছি। আমি অপরাধীরে মা, আমি অপরাধী।’ বলে চিৎকার করে কাঁদলো পুষ্পা। তিথি মাকে বুকে জড়েয়ে বললো, তোমার মতো আর কোন মেয়ের কূলে যেন তার বাবার অকাল মৃত্যু না দেখতে হয়, আমি সে লক্ষেই এখানে কাজ করবো।

হঠাৎ পুষ্পা হাসলো আর বলো, ‘আমার র্পূণতা আমার মেয়ে।’ মায়ের মুখে হাঁসি জন্মরে পর এ প্রথম দেখলো তিথি, মাকে কখনো এভাবে সে হাসতে দেখেনি। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে তিথি বললো, ‘জানো মা পৃথিবীর শেষ্ঠ কোমল ও অর্স্পশ  সুর্ন্দযের সামনে আজ আমি দাঁড়িয়ে। কিন্তু কষ্ট হচ্ছে এ বলে আমি তা ছুতে পাচ্ছিনা।’ মা বুঝতে পারলো, তাই তিথিকে জড়িয়ে ধরলো আর বললো, ‘এখন আর ভয় হয়নারে মা, নিশ্চয়াতা এখন তুই।’

লেখক: হোসাইন আল-মাদানী

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here