প্রকৃতির নীরব আশ্চর্য হামহাম জলপ্রপাত

0
45

১স্টাফ রিপোর্টার,সময় সংবাদ.কম

ঢাকা: রমণের পরিপূর্ণতা পেতে, কৌতুহলকে বাস্তবে রূপ দিতে হামহামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম আমরা সাত জন প্রায় চার ঘণ্টা ভ্রমণের পর হামহামের আশেপাশে কোন একটি এলাকায় পৌঁছলাম সবাই ব্যাগ, খাবার, ইত্যাদি গুজগাজ করে জলপ্রপাতের উদ্দেশ্যে সবুজ চা বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম বাগানের ভেতরকার সৌন্দর্য ছিলো মনোমুগ্ধকর বাঁশের তৈরি ছোট ছোট বাড়ি আর সবুজ চাপাতার রং প্রকৃতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিলো সবকিছু মনে হচ্ছিল রূপকথার গল্পের মতো আধ ঘণ্টা হাঁটার পর হঠাৎ চোখে পড়লো কিছুসংখ্যক ছোট ছেলেমেয়ে বাঁশের লাঠি সবার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে আর পাঁচ টাকা করে চাচ্ছে বললো পাহাড় আর জঙ্গলের ভেতরে হাঁটার সময় সাপের হাত থেকে আত্মরক্ষার্থে ওগুলোর প্রয়োজন পড়বে

শুরু হলো পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটা আমরা প্রায় তেরষোল জন ছোট বড়, উচু মাঝারি পাহাড় অতিক্রম করেছিলাম জলপ্রপাতে পৌঁছবার জন্য ছোট দুটা পাহাড় অতিক্রম করার পর বনপোঁকার উপদ্রব টের পেলাম, বুঝলাম যত গভীরে প্রবেশ করবো পোঁকার উপদ্রব আরো বাড়বে হয়ত সবাই গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে দিলাম লক্ষ্যে আসলো নানা প্রজাতির গাছের মৃতদেহ, বিশাল আর মাঝারি ধরনের গাছগুলো তাদের শৈশব থেকে বৃদ্ধ সময়টা একি জায়গায় বিসর্জন দিয়ে গেছে, কোন স্থানান্তর না হওয়াতে প্রাকৃতিক সম্পদ গুলো বিনষ্ট হচ্ছে নীরবে যোগাযোগ ব্যবস্থার লেশ মাত্র না থাকার কারণই হয়ত প্রধান অন্তরায়

পাহাড়ের উঁচু নিচু, সরু আর ঢালু রাস্তা দিয়ে এগুচ্ছি, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড় মাঝে মধ্যে এমন কতগুলো পাহাড় অতিক্রম করতে হলো ভীষণ ভয়ে যার বর্ণনা মনে আসলে গা শিউরে উঠে দুটি থেকে তিনটি পথ পেরুতে হয়েছে পাহাড়ের একেবারে শেষ প্রান্ত দিয়ে, যা ছিলো ভীষণ সরু আর পিচ্ছিল সামান্য অসাবধানতাঃবশত ঘটতে পারতো মারাত্মক কিছু প্রায় পচিশত্রিশ ফুট উঁচু পাহাড়ের পাদদেশ থেকে লক্ষ্য করছিলাম দু পাহাড়ের মধ্যখানে খালের অস্তিত্ব তাকিয়ে রইলাম আর ভাবলাম মৃত্যু কত কাছে এখানে

তারপর একটি পাহাড়ের ঢালু অতিক্রমের তিক্ত অভিজ্ঞতা না বললেই নয় ঢালুটি প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচু হবে সমতলে পৌঁছাবার ভিন্ন কোন পথ ছিলোনা এতটাই পিচ্ছল ছিলো যে, ভুল করা দূরে থাক, প্রখর সচেতনতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও ঘটে যেতে পারে ভয়ংকর কিছু এখানে দাঁড়ালে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখা যায় ভীষণশান্তভয়ংকরপাহাড়ের ঢালু ওঠি আমার দেখা দুটিমরণপুরিরমধ্যে একটি ঘটলো কি, ঢালু পেরুবার পূর্বে পঁয়ত্রিশ ঊর্ধ্ব ছয়সাত জনের একদল ত্রিশ ফুট ঢালু দেখে ভয়ে তাদের যাত্রা থেমে দিলো শুনলাম তাদের কানাঘুষোর মধ্যে দিয়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলাম আমরা, তাতেও কাজ হলোনা দেখলাম একদল পঁয়ত্রিশ ঊর্ধ্বদের বয়স আর দায়িত্বের কাছে নীরবে হাঁর মেনে নেওয়াকে কত সহজে পিছুটানের (দায়িত্ব আর পরিবার) কাছে পরাজয় বরণ করে নেওয়াকে ভাবলাম হয়ত পঁয়ত্রিশ ঊর্ধ্বদের কাছে এর সৌন্দর্য অজানাই থেকে যাবে যদি না যোগাযোগ ব্যবস্থার তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না আসে তল্লায়

২এবার নামলাম বেশ লম্বা খালের মধ্যে যার স্রোতধারা দু পাহাড়ের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো বেশ পরিষ্কার পানি দেখে অনুমান করছিলাম হয়ত জলপ্রপাতের খুব কাছেই চলে এসেছি লম্বা খাল আর তার উপর হাঁটুজল পানি পেরুতে হলো অনেকক্ষণ আমার দেখা দ্বিতীয়মরণপুরি যে ছিলো ওখান একটু একটু করে যখন সামনে এগুচ্ছিলাম, তখন মনে হলো অধিকাংশ পাহাড়ের নীচে হয়ত পাথরের বিশাল আকারের স্তুপ বিদ্যমান আছে কারণ লক্ষ্য করলাম সময় খালের যতটা অংশে পানি ছিলো ততটা অংশেই পাথরের স্তুপ ছিল আর ছোট বড়, সরু পাথরের খণ্ড খণ্ড অংশে ছিলো খালবর্তী, যার উপর দিয়ে এগুচ্ছিলাম দ্বিতীয় মরণপুরি বলার কারণ হলো, পাথর খণ্ডগুলো এমন সরু আর পিচ্ছল ছিলো যে, যেকোনো সময় পা পিচ্ছলে ভীষণ বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারতো নিজ চক্ষু দ্বারা না দেখে ওমন অনুভূতি আসবে না হয়ত কখনো

খালটা অতিক্রম শেষে, কানে আসলো উঁচু জলপ্রপাত হতে পানি পড়ার শব্দ ভাবলাম অসংখ্য বিপদ হাতে নিয়ে আসাটা বুঝি এই স্বার্থকতা পেতে চলো দূর থেকে জলপ্রপাতের দর্শন লাভ করতে পারলাম একঝলক তারপর বুকটা আনন্দে ভরে উঠলো অবচেতন মন ফিসফিস করে বলতে শুরু করলো আমায়, কি খুশী তো? এখন বুঝি তোমার স্বপ্নের জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছো? কেমন অনুভূতি তোমার আজ? ইত্যাদি..ইত্যাদি আলতো করে মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বললাম হ্যাঁ রে

ধীরে ধীরে জলপ্রপাতের সামনে এগিয়ে আসলাম মন ভরে তার বিশাল সৌন্দর্য অবলোকন করলাম অবচেতন মন চোক্ষুকে সাক্ষী রেখে বললো, কত সুন্দর তাই না? তুমি আজ পেরেছো, হৃদয়ের চাওয়াকে আজ সত্যরূপ দিলে, তুমি জয়ী, ইত্যাদি জলপ্রপাতের ওমন জলস্রোত হৃদয় মনকে প্রায় ভুলিয়ে দিয়েছে বাড়ি ফেরার কথা ফিরতে হলো প্রাকৃতিক নিয়মেই কারণ ওখানে কোন জনবসতি ছিলো না আনন্দ উল্লাস শেষে, ওখান থেকে বেরিয়ে আসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা শুরু করলাম

দেহটাকে টেনে ঠিকই নিয়ে আসছিলাম কিন্ত মনটাকে কোনভাবেই নান্দনিক সৌন্দর্য হতে ফিরাতে পারছিলাম না তারপরও ক্লান্ত দেহটাকে নিয়ে উঁচু নিচু আর ঢালু পাহাড় পেরুতে হলো মরণপুরির যে ঢালুটা দিয়ে নিচে আসছিলাম, তা আবার ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠতে হলো

বিশ্বাস করেন শরীরের নব্বই শতাংশ শক্তি খরচ করে সে উঁচু পাহাড়টা বেয়ে উঠলাম তারপর পাহাড় থেকে পাহাড় পেরিয়ে জনবসতিতে চলে আসলাম ভয় কাটলো আর ভাবলাম এই বুঝি নিরাপদ হলাম তবে শেষে বুঝলাম, পৌঁছাতে যে দু ঘণ্টা সময় লেগেছিলো তার চেয়ে বেশি সময় লেগেছিলো ফিরে আসতে তারপর মাইক্রোতে বসার পর স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললাম আরো একবার গুজগাজ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে মাইক্রো ছাড়লো

বাড়ি ফিরে আসলাম রাত্রে চোখের সামনে জলপ্রপাতে ঐশ্বরিক সে সৌন্দর্য ভেসে আসছিলো বার বার একই সাথে ভয়ে গা শিউরিয়ে উঠছিলো বিষণ্ণ মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণে আসলে হঠাৎ অবচেতন মন জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘পৃথিবীর সকল আশ্চর্য সৌন্দর্যই কী ভয়ংকর সবকিছু দিয়ে ঢাকা থাকে? মৃদু স্বরে আমি বলেম না, আবার বলেম হয়ত!

লেখক:হোসাইন আল-মাদানী

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here