বরুনের ছোটবেলা

0
178

সময় সংবাদ বিডি
ঢাকাঃ গ্রামের কৃষক পরিবারে বরুনের বেড়েওঠা।ছোটবেলা থেকেই সে নিজের কাজ খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে করতো। মায়ের সব কাজেই সে সহযোগিতা করতো, মা উঠানে ধান শুকাতে দিলে, বরুন পাখী ও মোরগ তাড়াতো, গৃহস্থালির কাজেও মায়ের সাথে থাকতো, তাছাড়া এটা ওটা এখান থেকে ওখানে নিয়ে আসা যাওয়াতেও মাকে সহযোগীতা করতো। এজন্য মায়ের আদর সে পেতো। তার সে আদর পাওয়াটা অন্য ভাইদের চোখেমুখে সহ্য হচ্ছিলনা, প্রায়ই বরুনের সাথে হিংসা করতো তারা। ছোটবেলা থেকেই বরুন ছিলো খুব বুদ্ধিমান ও বেশ শান্ত স্বভাবের। বিদ্যালয়ে ভালো ফলাফল সবসময় করতো, ভালো ফলাফল ও শান্ত স্বভাবের হওয়ায় শিক্ষকদের ভালোবাসার পাত্র ছিল বরুন। তার অন্য ভাইদের এটাও সহ্য হতো না, তারা চাইতো বরুন পড়ালেখা না করুক। কারণ কুসংস্কারের গণ্ডিই যারা ডিঙ্গাতে পারেনি, শিক্ষা অর্জন তাদের কাছে আষাঢ়ের গল্প মাত্র।

সবসময় বরুনের সাথে তারা খারাপ ব্যবহার করতো, মারপিঠ করতো নানা সময়, এমনকি বিদ্যালয়ে যাওয়া আসাতেও বাধা দিতো। কখনো প্রতিবাদ করেনি বরুন, চোখের জল ফেলে মাথা নুয়ে নিরবে সহ্য করেছে সব। কিন্তু এসবের অন্ত খুঁজে পায় না। এ নিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলে, কখনো এড়িয়ে যেতেন বা কখনো বলতেন, ওদের স্বভাবই ওমন, ছেড়েদে ওসব কথা। কিন্তু বরুনের মনে প্রশ্ন থেকেই যেতো, বাবার নিঃশব্দতা, ভাইদের মারপিট ও খারাপ আচরণ এবং ভাইদের প্রসঙ্গে মায়ের কথা এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে। এতে সে চিন্তিত থাকতো খুব। লুকিয়ে লুকিয়ে ধান ও দুধ বিক্রি করে বরুনের পড়ালেখার খরচ যোগাতেন মা, তাই মা’ই ছিলো ওর শেষ আশ্রয়স্থল। এদিকে বরুনের বাবা ও ভাইয়েরা চাইতেন না সে পড়ুক, তারা চাইতেন ক্ষেতখামার, কৃষিকাজ করুক। কিন্তু কৃষি জীবনের প্রতি বরুনের কোন আগ্রহ ছিলো না, তার তন মন সবকিছু ছিলো যেনো জ্ঞান-পিপাসু, ডুবে থাকতো আপন চিন্তা রাজ্যে এবং ঐ রাজ্যতেই ঘুরপাক খেতো সবসময়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রত্যেক ক্লাসেই প্রথম স্থান অর্জন করতো, তাই শিক্ষকদের বেশ ভালোবাসা ও সহযোগীতা পেতো।

অন্ধ্যের মতো সহ্য করে যাচ্ছিলো বাবা ও ভাইদের অন্যায় ও খারাপ আচরণ। ভীষণ বাজে ও করুণ সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো যা মায়ের লুকিয়ে ও স্যারদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় বেরিয়ে আসে এবং লেখাপড়া চালিয়ে নিতে সমর্থ হয়। বিজ্ঞান থেকে মাধ্যমিকে বরুন সর্বোচ্চ ফলাফল করে। মাকে এসে বলতেই, মা হাঁসিতে বরুনকে বুকে নিলেন। কিন্তু মায়ের মুখে চাপা চিন্তার ভাজ দেখতে পেলো সে। কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর বলেন, সামনের খরচ কি করে চালাবো, এদিকে আবার তর ভাইদের আচরণ খুব সন্দেহজনক, তাই তর জন্য ভীষণ চিন্তা হচ্ছেরে বাপ, বরুনকে জড়িয়ে কাঁদলেন মা। বরুনের ওমন ক্রমাগত উন্নতি তার ভাইদের আরো বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলে। তাই উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে শহরের একটি কলেজে যাবে বলে মনস্থির করে এবং মাকে এসে বলে। নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন অসহায় মা শান্ত বরুনের দিকে। মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে একদিন বেরিয়ে পড়ে শহরের উদ্দেশ্যে।

শিক্ষকদের সহযোগিতায় রাজধানীর ভালো একটি কলেজে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে শুরু করলো। শহরে চলে আসায় মায়ের সাথে আর সে  যোগাযোগ রাখতে পারলো না। তাই কলেজের যাবতীয় ব্যয় নিজের কাঁধেই বহন করে যেতে থাকলো, কখনো টিউশন করে কখনো রেস্তোরায় কাজ করে। শহরের অচেনা পরিবেশের সাথে নিজেকে খুব যত্নের সাথে মানিয়ে নিলো এবং পড়ালেখায় নিজেকে শতভাগ প্রমাণ করতে থাকলো। উচ্চ মাধ্যমিকেও নিজ বিচক্ষণতার পরিচয় দিলো ভালো ফলাফল করে। কলেজে থাকা অবস্থায় পরিচয় ঘটলো তাঁর এক মেয়ে সহপাঠীর সাথে। জীবনের ফেলে আসা বিবর্ণ সব ঘটনা ওর কাছে বলতো প্রায়ই। এভাবে একসময় তাঁরা বেশ ভালো বন্ধু হয়ে উঠে। গল্প করতে করতে কখন যে সময় ফুরিয়ে যেত তারা বলতেই পারত না। এভাবে চলতে থাকে তাদের দিনগুলি। এদিকে বরুনের ফলাফল প্রকাশ হলো, বরুন চমৎকার ফলাফল অর্জন করে। তাঁর ঐ সহপাঠীও ভালো করে। টিউশন করে, খেয়েদেয়ে যে অল্প কয়টি টাকা অবশিষ্ট থাকে সেখান থেকে জমা রাখতো মাকে দেখতে আসবে বলে। ফলাফল প্রকাশের পর মাকে জানাতে ভাইদের শত ভয় মনের শক্তিতে উপেক্ষা করে বাড়ি আসলো।

কতদিন মাকে দেখেনি, বুকটা হাহাকার করছে তার। মাকে দেখার পরই বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো এবং বললো “মা আমি এবারও সর্বোচ্চ ফলাফল করেছি।” বলে চিৎকার করে আবার কাঁদলো, মাও ছেলেকে ধরে কাঁদলেন। কত দিন পর ছেলে বাড়ি এলো, মা রান্না করে তাঁকে খেতে দিলো। বরুনের এ সংক্ষিপ্ত ফিরে আসাতেও তাঁর ভাইদের ও বাবার চলাফেরা ছিলো বেশ সন্দেহজনক। বুঝতে পারলো সেটি কিন্ত সে নিরুপায়, সকল অধিকার থাকা সত্ত্বেও বরুন ছিলো অনাথের মতো নিজ বাড়িতে। কারণ তাঁর বাবা ও ভাইদের গায়ের জোর ছিলো এতো বেশি, যে ভয়ে কেউ কথা বলতে আসতো না। তাই বরুন পরিস্থিতি গোলাটে হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়লো শহরের উদ্দেশ্যে আবার।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফলাফল থাকায় বরুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেলো এবং তা চালিয়ে যেতে থাকলো। টিউশন করে পড়ালেখার ব্যয়ভার সামলানো ভীষণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তাই পাশাপাশি একটি কলেজে শিক্ষকতা শরু করে। টিউশন ও শিক্ষকতা করে থাকা, খাওয়া, ও নিজ খরচ ইত্যাদি কোনভাবে চালিয়ে নিচ্ছিলো। স্নাতকে ভালো ফলাফল অর্জন করায়, তাঁর খুব কাছের একজন শিক্ষকের পরামর্শ ও সহযোগীতায় ইরানের একটি বিশ্ববিদ্যলয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ পায়, গেলো ওখানে। তারপর ঐ ডিগ্রী অর্জনের পথেও নেমে আসলো দারিদ্র্যের চরম নির্মমতা। ওখানে যা অল্প রোজগার করতো, তাতে নিজ ভরণপোষণ করতেই হিমসিম খাচ্ছিলো, তার উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন অত্যধিক কঠিন হয়ে পড়েছিলো। বাধ্য হয়েই ফিরতে হলো স্বদেশে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অবস্থায় তাঁর যে কলেজ পড়ুয়া মেয়ে বন্ধুর সাথে যোগাযোগ হয়, তাঁদের মধ্যে সবকিছু শেয়ার হয় আবার, এভাবে এক পর্যায়ে দুজন দুজনার খুব কাছে চলে আসে নিজেদের অজান্তেই। তাতেই বরফ গলতে শুরু করলো, এক পর্যায়ে তা রূপ নিলো বিয়ে পর্যন্ত। অতঃপর বিয়ে। দু’জনের সংসার বেশ ভালো ভাবে চলতে থাকলো। পাঁচ বছরের মাথায় বরুন দু’সন্তানের জনক। শিক্ষকতা করে সে পরিবার ভালোভাবেই সামলিয়ে যাচ্ছিলো। বরুনের সন্তান যখন কথাবার্তা বলতে শিখে গেলো, নানান সময় দাদা দাদীকে দেখবে তাদের বাড়ী যাবে, তাদের সাথে খেলবে ইত্যাদি বলতো বাবাকে। বরুন তখন কাজের বাহানা ধরে ছেলেকে শান্তনা দিতো।

হঠাৎ একদিন নিজে থেকেই বরুন স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে রৌয়ানা হলো নিজ বাড়ী, স্ত্রী সন্তানকে মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে আসবে। বাড়ী পৌঁছালো। অনেক দিন পর মা বরুনকে দেখতে পেলো, বরুনের মুখেও একি আনন্দনের চাপ। তারপর সন্তানকে পরিচয় করিয়ে দিলো তাঁর দাদীর সাথে এবং স্ত্রীকে মায়ের সাথে। তাঁর সন্তান দাদীকে পেয়ে আনন্দের সীমা রইলোনা, দাদীর কুলে উঠলো। কিন্তু সে সুখ বেশিক্ষণ থাকলো না, বরুন বাড়ী আসাতে বাবা ও তার ভাইদের সহ্য হচ্ছিলো না, তারা নানা খারাপ কথাবার্তা বলতে শুরু করলো। এমনি স্ত্রী সন্তান সহ মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিলো। স্ত্রী ও বরুনকে ঐ দিন রাত্রে একটি ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হয়, কোন প্রকার খাবার দেওয়া হয়নি তাদের। সন্তান দাদীর কাছে দাদীর কাছে থাকলো ঠিকই কিন্তু পানি ছাড়া অন্য কিছুই খেতে দেয়নি বরুনের নরপিশাচ বাবা।

তিনবছরের সন্তান নিষ্ঠুরতা বুঝেনা, বুঝে খিদে পেলে খাদ্য, তা খুঁজে না পেয়ে খিদের যন্ত্রণায় কাঁদতে শুরু করলো। এতেও নরপিশাচ বাবার হৃদয়ে একটুও সহানুভূতি আসেনি, একসময় ছোট সন্তানটি খোদার যন্ত্রণায় চাটাচাটি করে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সকালেই বরুন স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লো, এবং শহরে আবার ফিরে এলো। ঐ দিন রাত্রের নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা আজও বরুনকে তাড়া করে বেড়ায়। শহরে ফিরে পূর্বের মতোই কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকলো বরুন। আনন্দ, হাঁসি খুঁশিতে ভালো সময় পার করছিলো স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে। কিন্তু সে আনন্দ, সুখ যেন সইছিলোনা তাঁর কপালে। বুঝতে পারলো, সংসারের প্রতি স্ত্রীর আগ্রহ ক্রমেই কমে আসছিলো। এ নিয়ে নানান সময় কথা কাটাকাটি, ঝগড়া, অশান্তি লেগেই থাকতো সংসারে। হঠাৎ একদিন বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায় তাদের মধ্যে। সর্বহারা বরুন স্ত্রী সন্তানকে হাঁরিয়ে একা ও নিসঙ্গ হয়ে পড়ে। মা ও পরিবার হাঁরা বরুন এবার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকুও হাঁরিয়ে বসলো। একা একটি মুহূর্ত পার করা তাঁর কাছে বিষণ্ণ লাগছিলো, তারপর বরুনকে নিয়তির আরেক বিভীষিকা দেখতে হলো।

শিক্ষকদের ঈর্ষা ও রাজনীতিক কারণে একপ্রকার বাধ্য হয়েই কলেজ ছাড়তে হয়। এমন দুঃসময়ে তাঁর পাশে শান্তনা দেবার মতো কেউ নেই। মনের দিক থেকে প্রবল ও সাহসী বরুন ভেঙ্গে পড়লো না। নিয়তিকে মেনে নিয়ে হাটতে শুরু করলো আবার, নতুন উদ্যমে। এদিকে বিভিন্ন সময়ে ছেলে ও মেয়ের সাথে বরুনের যোগাযোগ ও কথাবার্তা হতো। ওরা নানা নানুর সাথে বড় হতে থাকে। এবং বরুনের স্ত্রী হঠাৎ একদিন অন্যত্র বিয়ে করে নেয়।

চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বরুন মারাত্মক বাজে ভাবে পার করে। এমনও হয়েছে দু’তিন দিন আহারই করেনি। পানি ছাড়া কিছুই জুটেনি ওর কপালে তারপরও মনোবল হাঁরায়নি। কিন্তু নোংরা রাজনীতি যেন তার পিছু ছাড় ছিলোনা। তাই সে অন্য আরেক শহরে চলে আসে সব স্মৃতি উপেক্ষা করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কর্মক্ষেত্র না খুঁজে সম্পূর্ণ অপরিচিত, নিজ শিক্ষার বাহিরে এসে, ভিন্ন একটি কাজ বেছে নিলো বরুন শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে। মৌরির কাজ শিখে বেঁচে থাকার অন্যটুকু যোগাচ্ছিলো। অভাব অনটন, অবহেলা আর অনিদ্রার সাথে লড়াই করে শেষমেশ ঠিকে থাকার সুযোগ হলো তাঁর।

ওখানকার এক পরিবারের সাথে ভালো পরিচয় গড়ে উঠে তাঁর। গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী বরুনকে ভালো নজরেই দেখছিলেন। এক সময় বরুন গৃহকর্ত্রীকে মা বলে ডেকে নিলো। সম্পর্ক আর গাঢ় রূপ ধারণ করলো এতে। দীর্ঘ সময় সে অতিবাহিত করে টিনের চাল ও মাটির দেয়ালের ঐ কুড়ে ঘরটিতে।

প্রায় পনেরো বছর ধরে বরুন মৌরির কাজ করছে এবং ঐ কুড়ে ঘরটিতেই আছে। একটু আঁকা বাঁকা পথের দিকেই হাঁটলেই পারতো দারিদ্র্যের কোষা গাঁ থেকে সরাতে। সুযোগও এসেছিলো বেশ অনেক বার কিন্তু ন্যায় ও সত্যের মধ্যে অবিচল থাকা বরুন কখনো পবিত্র হৃদয়কে কুলষিত করেনি বিলাসবহুল জীবনের হাতছানির কাছে। দুটানে থেকেও, অসৎ ও অন্যায় পথকে এড়িয়ে চলেছে সবসময়, অন্যদেরও বলেছে তা এড়িয়ে চলতে। সততা, পবিত্রতা ও ন্যায়কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চেয়েছে। কখনো নিজের উন্নত সত্ত্বাকে জীবনের অন্যায় আনন্দের কাছে বিক্রি করে দেয়নি। শীর উচু করে বেঁচে থাকতে চেয়েছে।

পঞ্চাশের ঘরে এসেও একজন লোক কতো সাবলীল ভঙ্গিমায় চতুরতার সাথে নিজেকে প্রমাণ করেই যাচ্ছে দাপটের সাথে, ন্যায়ের সাথে। এতে যে কারোরই ঈর্ষান্বিত হওয়ারই কথা। লেগেও ছিলো কিছু লোক, তবে সৎ পথ সহজ ও সরল হওয়ার কারনে বরুন সফল হয়েছিলো তাদের বিরুদ্ধে। মনের শক্তি ও যৌবনরস দিয়ে যে রাজ্য সে পরিচালনা করে আসছিলো তাতে অল্প অল্প করে পোঁকা ধরতে শুরু করলো। কথিত আছে, বার্ধক্যের কাছে বীর পালোয়ানের মশাল ও নিবু নিবু করে, বিশাল ভূখণ্ড রাজত্ব করা রাজাকেও ক্ষমতার পালাবদল করতে হয়, মেনে নিতে হয়। আর বরুন তো খুব সাধারণ একজন, প্রকৃতির নিয়মনের বাহিরে যাওয়ার সাধ্য কই। তন মন ক্লান্ত হয়ে আসছিলো ওর, অসহায় হৃদয়টা হয়তো খুঁজছিলো এমন কাউকে যে তাঁর ভাঙ্গা হৃদয়টাকে আশ্রয় দিবে এবং বারি মনটাকে আচল দিয়ে অনুপ্রেরণা জোগাবে। যে তাঁর জীবনের ঘটা সকল কিছু জেনেও কাছে টেনে নিতে আগ্রহী, শূন্য মনটাকে কূলে আশ্রয় দিবে নির্দ্বিধায়। সচ্ছ মানুষটা তা খুঁজে পেতে বড্ড বেগ তো পেয়েছে বটে, টগেছেও ভীষণ। এক সময় সচ্ছতা ও ধৈর্য্য ভাগ্যের দোয়ার খুলে দিলো। তাঁরই মতো আরেক জনমদুখিনী সর্বহারা বিয়ে করতে আগ্রহ প্রকাশ করলো। একে অন্যের সাথে জানাজানিটা মাস কয়েক হলো। অতঃপর বিয়ে। সর্বহারা বরুন শেষবেলায় এসে মুক্তি পেলো, নিজ দেহটাকে নিরাপদে আশ্রয় দেবার মতো জায়গা খুঁজে পেলো।

ভালো বুঝাপড়া, প্রায় সমবয়সী তার উপর দুজনার বেদনাও এক, এ যেনো বিশাল জলশূন্য মরুভূমিতে ছাঁয়ার সাথে দেখা হলো দুজনার। দুজনের সংসার বেশ ভালোভাবেই পার করছেন। একদিন স্ত্রী অর্চনা দেবীর কাছে খুলে বললো তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া সব বিমর্ষ ও করুণ কাহিনী। অর্চনা লক্ষ করলো বরুনের চোখ মুখ বেদনার কান্নায় আশ্রিত হয়ে আসছে, তাই অর্চনা বুকে জড়িয়ে নিল বরুনকে। চাপা কান্নায় বুক বাসালো সে। তারপর অর্চনাকে বলল জানো অর্চনা, ‘ছেলেমেয়ে হারিয়ে, স্ত্রী হারিয়ে, বিটেতে থাকার অধিকার না পেয়েও, এমকি বিটে বঞ্চিত হয়েও আমার ততটা কষ্ট হয়নি, যতটা কষ্ট হয়েছে আমার মৃত মায়ের মুখ শেষবারের মতো না দেখতে পেরে’। অর্চনা, মায়ের মুখ শেষবারের মতো না দেখে চির বিদায় জানানোর মতো দূর্ভাগা সন্তান একমাত্র আমিই এ পৃথিবীর বুকে। জানো অর্চনা, মাকে শেষবার না দেখার কষ্ট, বেদনা ও হাহাকার আমার ছেয়ে কেউ ভালো জানে না। আমার জন্মের স্বার্থকতা অসম্পূর্ণ থেকে গেলো অর্চনা, অসম্পূর্ণ থেকে গেলো ইত্যাদি বলে কাঁদতে কাঁদতে লুটে পড়ে স্ত্রীর কুলে। অর্চনা অবাক দৃষ্টিতে হয়ে তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে। অর্চনা চোখের কান্না আড়াল করে, হৃদয়ের কান্নায় বিধাতার কাছে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলো এমন সংগ্রামী, স্বাধীন চেতনার মানুষটিকে শেষবেলায় জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে। এবং সে আরও প্রার্থনা করলো জীবনের শেষনিঃশ্বাস থাকা অবস্থায় স্বামীর সেবাযত্ন করে যেতে তাঁর শরীর ও মন যেনো সক্ষম ও সুস্থ রাখেন বিধাতা।

লেখক: হোসাইন আল-মাদানী,
মাস্টার ইন লিডিং ইউনিভার্সিটি

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here