বিলুপ্তির পথে তালগাছের দৃষ্টিনন্দন বাবুই পাখির বাসা 

0
173

নুরনবী মিয়া, নিজস্ব প্রতিবেদক: কবি রজনীকান্ত সেন লিখেছেন “বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়েঁ ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে অট্রালিকার পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টির ঝড়ে।” কবির কালজয়ী এ ছড়ায় বলা বাবুই পাখির অাবাস সমৃদ্ধ তালগাছ আজকাল তেমন চোখেই পড়েনা। দেখা মেলেনা সাদা চঞ্চল কর্মঠ এ বুননশিল্পী পাখি আর গ্রাম-বাংলার মাঠের ধারে, পুকুর পাড়ে  সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ। ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার এসব পুরনো রূপ বৈচিত্র্য। তেমনি হারিয়ে যেতে বসেছে প্রকৃতির শিল্পী পাখির ভোরবেলার কিচিরমিচির সুমধুর ডাকাডাকি।
মূলত তালগাছেই বাসা বাঁধতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বাবুই পাখি। বাবুই পাখিকে বলা হয় নিপুন কারিগর। বাবুই পাখিরা শারীরিক ভাবে ছোট হলেও তাদের রয়েছে অনেক বড় জ্ঞান ভান্ডার। এক সময় গ্রামাঞ্চলে অবাধ বিচরণ ছিল তাদের। মন মাতানো কিচিরমিচির সুরেলা শব্দ আগের মত শোনা যায় না। তেমন  চোখেও পড়েনা বুদ্ধিমান বাবুই পাখি ও তাদের দৃষ্টিনন্দন বাসা।
পাখিটি সু-নিপুনভাবে খড়ের ফালি, ধান, তাল, খেজুর, সুপারি, নারকেল গাছের কচিপাতা,  বাঁশবনের লতাপাতা দিয়ে উচু তাল, সুপারি ও খেজুর গাছে চমৎকার আকৃতির বাসা তৈরি করে বসতি করতো। বাবুই পাখির বাসা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি মজবুত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রবল ঝড়ে বাতাসের সাথে টিকে থাকতে হবে এমনটা মাথায় রেখে তারা বাসা তৈরি করে। বড় আশ্চর্যের বিষয় হলো আবহাওয়ার তারতম্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে বাসার ভিতরে থাকে কাঁদা ও গোবরের প্রলেপ। বাসার ভিতরে ঠিক মাঝ খানে একটি আঁড়া তৈরি করে থাকে। যেখানে পাশাপাশি দুটি পাখি বসে প্রেমালাপসহ নানা রকম গল্প করে। তারপর চির নিদ্রায় যায় এ অাঁড়াতেই।  দেখা গেছে মুক্ত মনের বাবুই পাখির বাসাটা টেনেও ছেড়া খুব কঠিন।
জানা যায় পুরুষ বাবুই পাখি এক মৌসুমে ছয়টি পর্যন্ত বাসা তৈরি করতে পারে। অথাৎ এরা ঘর -সংসার করতে পারে ছয় সঙ্গীর সাথে। তাতেই স্ত্রী বাবুই ‘র বাধা নেই। প্রজনন প্রক্রিয়ায় স্ত্রী বাবুই ডিমের তাপ দেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা দেয় এবং তিন সপ্তাহ পর বাবুই বাচ্চা ছেড়ে উড়ে  যায়। স্ত্রী বাবুই দুধ,ধান সংগ্রহ করে এনে বাচ্চাদেন খাওয়ায়।
বয়স্করা জানান, আগে কুড়িগ্রাম জেলার প্রত্যান্ত  গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় চোখে পড়তো দৃষ্টিনন্দন বাবুই পাখির বাসা। পাখিটি খুবই বুদ্ধিমান, আকারে ছোট হলেও বুদ্ধিতে হার মানিয়ে দেয় অন্য সব পাখিদের। বর্ষা মৌসুমেও নিজ বাসায় নিরাপদে থাকে এই পাখি। লাগামহীন গুড়ি গুড়ি বাদলের হালকা হাওয়ায় উঁচু তালগাছে দোল খায় বাবুই পাখির বাসা। জানালা দিয়ে এরকম দৃশ্যপট দেখতে খুবই সুন্দর লাগতো। এখন গ্রামীণ পল্লীতেও হারিয়ে গেছে এসব প্রাকৃতিক দৃশ্য।
পাখি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বাবুই পাখি একাধারে শিল্পী, স্থপতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। এরা এক বাসা থেকে আরেক বাসায় যায়, পছন্দেরর সঙ্গী খুঁজতে। সঙ্গী পছন্দ হলেই স্ত্রী বাবুইকে নিয়ে গাছের ডালে দু’জনই বাসা তৈরি করে সংসার পাতে। তাদের মতে, বাবুই পাখি খাবারের জন্য ঝাঁক বেধে চলতে ভালোবাসে। প্রতিটি বাবুই পাখির ওজন ১০০-১৫০ গ্রাম। এক দিকে বাবুই পাখি শিকার অন্যদিকে তালগাছ ও খেজুরগাছ বিলুপ্তির কারনে বিলুপ্ত হচ্ছে বাবুই পাখি । এ কারিগর পাখিকে বিলুপ্তির পথ থেকে রক্ষা করতর মানব সমাজকে সচেতন হতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here