ভূমধ্যসাগীয় এলাকায় থামছে না নৌযানডুবি

0
85

shagor

ডেস্ক রিপোট, সময় সংবাদ বিডি:

ভূমধ্যসাগীয় এলাকায় ইতালির উপকূলে সম্প্রতি নৌযানডুবিতে নয়শর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের তথ্যমতে, চলতি বছরেই ৩৫ হাজারের বেশি শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করেছে। আর চলতি মাসের ১০ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত—সাতদিনে ইতালির উপকূল থেকে ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে নৌযান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এই নৌপথে ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে অনুপ্রবেশকালে এ বছরই মারা গেছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। গত বছর প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার অবৈধ অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করেছে। ওই বছর ইউরোপে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে মারা গেছে সাড়ে তিন হাজার মানুষ।

নৌযানডুবির ঘটনায় উদ্ধার হওয়া মানুষরা জানান, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দারিদ্র্য, সন্ত্রাসবাদ ও চলমান সংঘর্ষের কারণেই তাদের বেশির ভাগ ইউরোপে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিল। অনেকের আশা ছিল উন্নত জীবন। এদের অনেকে আবার সাগরেই নৌযানডুবিতে মারা যাচ্ছেন। কয়েক দশক ধরেই এমন অবস্থা চলছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ঘটনা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে এ মৃত্যের সংখ্যা ছিল রেকর্ডসংখ্যক।

এরই মধ্যে গত সপ্তাহেই অপর একটি নৌযানডুবির ঘটনা ঘটেছে। জানা গেছে, নৌযানটিতে তিন শতাধিক যাত্রী ছিল। এদের উদ্ধারে মাল্টা ও ইতালি তৎপরতা চালায়। ৩৮ নারী ও এক শিশুসহ ২২৮ জনকে উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে একজন বাংলাদেশিও পাওয়া গেছে। ওই বাংলাদেশিকে ইতালির কাতানিয়ায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

নৌযানডুবির পর উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সূত্রে জানা গেছে, ইরিত্রিয়া, নাইজার, সিরিয়া, ইরাক, সোমালিয়া ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক বিভিন্ন পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে জানায়, এ সংকটের মূলে রয়েছে- আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভিন্ন দেশের লোকদের মধ্যে তীব্র খরা, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পরিবেশ বিপর্যয়, ফসলের হানি, পানি ও খাদ্যের অভাবসহ নানাবিধ সমস্যা। ইতালির ঠিক অপর পাশেই লিবিয়া। সেখানে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর ব্যাপক গোলযোগ ও সংঘর্ষ চলছে। নিয়মিত হামলা ও পাল্টা হামলায় অহরহই প্রাণহানি ঘটছে। সোমালিয়ায় আল-শাবাব জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম জঙ্গিগোষ্ঠী তৎপর। আর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা এই সংকটকে আরো বাড়িয়েছে। সংকটের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে এসব অঞ্চল থেকে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে। ছোট নৌযানে পরিবার-পরিজন নিয়ে গাদাগাদি করে সাগর পাড়ি দেয় অনেকে। এভাবে ইউরোপে যাওয়ার সময় মাঝপথেই ঝড়ের কবলে প্রাণ হারায় অনেকে।

নৌযানডুবির ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষের কাছ থেকে জানা যায় তাদের জীবনের গল্প। বেকার সমস্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় একসময় অনেকে দেশ ছেড়ে বিভিন্ন পথে বিদেশে পাড়ি জমায়। পরে নৌকায় করে ইটালির এখানে আসে তারা। তাদের অনেকেই এখন ইটালির বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আছে। এই কেন্দ্রগুলো সরকারি এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় চলে। যারা আঠারো বছরের নিচে, তারা এখানে থাকবে বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত। আর যারা বেশি বয়সী তাদের কাজ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে সবাই এ সুযোগ পায় না। অনেককেই নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। অনেকের স্থান হয় কারাগারে।

উদ্ধার হওয়া মানুষের কাছ থেকে জানা যায়, তাদের অনেকে নৌপথে মানব পাচারকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারায়। অনেক পাচারকারী শরণার্থীদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সাগরের মাঝে এনে নৌযান ডুবিয়ে দেয়।

সম্প্রতি দুজন পাচারকারীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে ইতালি সরকার। তাঁদের বিরুদ্ধে মানুষ হত্যা ও অবৈধভাবে অভিবাসী করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। এমন অনেক পাচারকারী রয়েছে যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে মানবপাচার বাড়ছে। অনেকে এসব অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে টাকার পাহাড় গড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মানবপাচার, নৌযানডুবি ও শরণার্থী নিহতের মতো ঘটনার বৃদ্ধিতে রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) বিশ্বের বিভিন্ন মানবিক সংস্থা। চলমান এ অবস্থায় উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘ সেখানকার দেশগুলোর প্রতি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেন, ‘ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় আমরা যেসব মৃত্যু ও ভোগান্তি লক্ষ্য করছি, তা সবার জন্য বড় দুঃখজনক ঘটনা। সেখানে হাজার হাজার অভিবাসী করুণ পরিণতির শিকার হচ্ছে, যারা খুবই দুর্বল, অরক্ষিত ও অসহায় মানুষ।’

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউনাইটেড ন্যাশনস হাইকমিশন ফর রিফিউজি-ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় নৌযানডুবিতে অভিবাসীদের জীবন রক্ষায় সেখানকার সব দেশের নেওয়া পদক্ষেপগুলো যথার্থ নয়। এ সংকট থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজনীয় আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেশগুলোর প্রতি আহ্বান সংস্থাটি আহ্বান জানিয়েছে।

চলমান এ জনস্রোত ঠেকাতে গত সোমবার ব্রাসেলসে জরুরি বৈঠকে বসেন ইইউর পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা। এ সময় তাঁরা সংকট নিরসনে অন্তত ১০ দফার একটি প্যাকেজ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সেখানে বলা হয়েছে, ভূমধ্যসাগরে অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নৌপথে মানবপাচার রোধে প্রচারণা চালাতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামে ইইউর শীর্ষ নেতারা আবার বৈঠকে বসেন। আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসীদের নৌকাডুবিতে হতাহতের ঘটনা বৃদ্ধির কারণে তাদের উদ্ধার ও সহায়তায় অর্থ তহবিল তিনগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইইউ নেতারা। ব্রাসেলসের ওই জরুরি বৈঠকে ইটালির পাচারকারীদের ব্যবহৃত নৌযান ধ্বংসে সামরিক পদক্ষেপ বিষয়েও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই কাজে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় রাষ্ট্র জাহাজ, হেলিকপ্টার ও জনশক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মাল্টার প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মাসকাট অভিবাসী নৌযান নিয়ন্ত্রণকারী অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান  দিয়েছেন। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল বলেছেন, ‘আমরা এ সংকট উত্তরণে আরো বেশি অর্থসম্পদ ব্যবহার করতে চাই, যাতে সীমান্তে আমরা পাহারা বাড়াতে পারি। পাশাপাশি আমরা সেখানে আরো বেশি যুদ্ধজাহাজ পাঠাব।’ ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতারা বলছেন, এ সংকট এখন কেবল ইটালির নয় বরং গোটা ইউরোপের। তাই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন তাঁরা।

ভূমধ্যসাগরের অপর পাশের দেশ তিউনিশিয়া, লিবিয়াসহ অন্যান্য দেশগুলোও কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ কারণে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।

তবে অসহায় মানুষের ওপর কড়াকড়ি আরোপের উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ। তাদের দাবি, অসহায় এসব মানুষের মানবাধিকারকে অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here