সামনে আসছে বিশাল নির্বাচনী বাজেট

0
207

স্টাফ রিপোর্টার, সময় সংবাদ বিডি-ঢাকা

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়নে চার লাখ ৬৫ হাজার ৫শ’ ৭৩ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন।

বাজেট বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৭ জুন) স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে ১০৩ পৃষ্ঠা বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপন করেন তিনি। নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই ব্যয় বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ২৫ এবং মূল বাজেটের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি। এর আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ।

বাংলাদেশকে ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথে’ এগিয়ে নিতে সরকার নতুন অর্থবছরে কত টাকা খরচ করতে চায়, সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, জনগণকে কোন কোন খাতে কর বা শুল্ক গুনতে হবে, সেই খতিয়ান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন। এবার মূল বাজেটের যে আকার মুহিত ধরেছেন, তা বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। গতবছর প্রস্তাবিত বাজেট ছিল জিডিপিরি ১৮ শতাংশ।
প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ কোটি টাকার এই বাজেটের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা, যার এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা যাবে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। আর অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে দুই লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ বার বাজেট দেওয়ার রেকর্ড স্পর্শ করা মুহিত বিশাল এই ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ অর্থ রাজস্ব খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছেন। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন মুহিত।
এছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে চার হাজার ৫১ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল দুই লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, আদায় সন্তোষজনক না হওয়ায় তা সংশোধন করে দুই লাখ ৫৯ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সংশোধন করে তা তিন লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকায় নামানো হয়।
বাড়তি খরচের চাহিদা মেটাতে অর্থমন্ত্রীকে বড় অঙ্কের ঘাটতি রাখতে হচ্ছে নতুন অর্থবছরে। বাজেটে ঘাটতি থাকছে এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এটি মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি’র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অবশ্য বাজেটে চার হাজার ৫১ কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার আশা থাকছে। ওই অনুদান পাওয়া গেলে ঘাটতি দাঁড়াবে এক লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
ঘাটতি মেটাতে অর্থমন্ত্রীর দরকার হবে এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৫৪ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। ঘাটতির বাকি ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা নেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যবস্থা থেকে সংগ্রহ করা হবে ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা।
সাত দশমিক আট শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, যাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক সাহায্য বৃদ্ধি, রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করে প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন তিনি। প্রস্তাবিত বাজেটে টাকার অংকে জিডিপি ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে জিডিপির আকার ২২ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত বাজেটে সেটাকে বাড়িয়ে ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল সাত দশমিক চার শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) তথ্য হিসাব করে বলছে, সাত দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাত দশমিক দুই শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের বিপরীতে সাত দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়।

বাজেট বক্তব্য অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে শুরু করে বিগত দশ বছরে আমাদের অগ্রযাত্রা কেবল শক্তিশালী নয় জনকল্যাণকরও বটে। এই দশ বছরে-উন্নয়নশীল অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি যখন ৫ দশমিক ১ শতাংশ তখন আমাদের প্রবৃদ্ধির হার হচ্ছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৭৫৯ মার্কিন ডলার থেকে এক হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলারে, দেশে মূল্যস্ফীতি কমেছে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে, রাজস্ব জিডিপি’র অনুপাত বেড়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ৩ শতাংশে, বাজেটের আয়তন বেড়েছে ৮৯ হাজার কোটি টাকা থেকে চার লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকায়, বার্ষিক রফতানি ১৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৩৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, বার্ষিক আমদানি ২২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক শূণ্য বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার নেমেছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে এবং হতদরিদ্রের হার কমেছে ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে।
সবার জন্য বাজেটে যা : জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষা করছেন, তাদের জন্য এই বাজেটে কী থাকছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা থেকে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো-আগামী অর্থবছরে ব্যক্তি করমুক্ত আয় সীমা বাড়ানো হয়নি। অর্থাৎ বছরে কারো আয় আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত হলে তাকে আয়কর দিতে হবে না। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। সে ক্ষেত্রে শুধু এসব কোম্পানির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ কর থেকে সাড়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতায় বয়স্ক ভাতার সুবিধাভোগীর সংখ্যা অতিরিক্ত পাঁচ লাখ বাড়িয়ে ৪০ লাখ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, পুত্র কন্যা অথবা নাতি-নাতনীদের সহায়তার ব্যবস্থা করছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। এজন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪শ’ কোটি টাকা। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আগামী অর্থবছর থেকেই সার্বজনীন পেনশন কার্যক্রম চালু করতে চান অর্থমন্ত্রী। সরকারি নবীন কর্মচারীদের গৃহঋণের জন্য নতুন নীতিমালা কার‌্যকর আগামী অর্থবছর থেকে। নিজের নামে দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আট হাজার বর্গফুটের গৃহ সম্পত্তির মালিকদের সারচার্জের আওতায় আনার প্রস্তাব। ভ্যাটের হার নয় স্তর থেকে পাঁচ স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। বড় বড় রিসোর্ট হোটেল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার এর বদলে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস বা ইএফডি মেশিন বসানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে ইএফডি ব্যবহারকারীদের অনলাইন স্থাপন করা সহজ হবে। হেলিপ্টার সেবার ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এতে করে ভাড়া বাড়তে পারে।
যানজট নিরসন ও স্কুলে যাতায়াত সহজ করতে কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ গাড়ির সার্ভিস চালু করলে তা আমদানি করতে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হাইব্রিড ১৬শ’ থেকে ১৮শ’ সিসির গাড়ি আমদানিতে ৪৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ শুল্ক কমানো হয়েছে। আগামী বছর থেকেই সার্বজনীন অবসর ভাতা পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি এলাকায় চালু করা হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here