“অবসর বিনে সুকুমার বৃত্তির চর্চা হয় কেমনে”

0


লেখকঃ মো. সফর আলী

লেখকঃ মো. সফর আলী
প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ,
রাজশাহী সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ।

লকডাউনে আটকে থাকতে থাকতে ইতিহাসের খুব মৌলিক একটা সূত্রের সাথে সম্প্রতি নিজের যাপিত জীবনের একটি যোগসূত্র খুঁজে পেলাম। একটু খোলসা করে বলি তাহলে, ঘরবন্দী থাকার ফলে অধিকাংশ মানুষের মত #খাবার, #বিছানা আর #ফেসবুক এই Bermuda Triangle এর মধ্যেই চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে আমার প্রাত্যহিক জীবন। গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে এবার মূল কথায় আসি। আমার জীবনে গোটাকতক ইতিহাস সংশ্লিষ্ট বিষয় ব্যতিত লেখালেখির বিষয়টি কখনোই তেমনভাবে ছিলনা, অবশ্য এখনো সেভাবে নেই। আমি কখনও তেমন seriously লেখালেখি করিওনি কখনো। তবে ইদানিং লকডাউনে বসে থাকতে থাকতে অলস মস্তিষ্কে যে কথাগুলো ঘুরেফিরে আসছিল, সেগুলোই ফেসবুকের মাধ্যমে প্রকাশ করতে শুরু করলাম। এরই মধ্যে দু’একটি লেখা অনেকেরই প্রশংসা পেয়েছি। ফলে উৎসাহিত হয়ে আবার আরো কিছু একটা লেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজকে হঠাৎ করেই একটু আত্মবিশ্লেষণ করতে বসে অবশেষে আমার লেখালেখির পেছনে একটা চমৎকার ঐতিহাসিক যোগসূত্র খুঁজে পেলাম সেটাই নিচে তুলে ধরছি।

প্রাগৈতিহাসিক যুগে আদিম সমাজের মানুষ প্রথম দিকে ছিল
‘খাদ্য সংগ্রাহক’
এবং পরে হয়েছিল
‘খাদ্য উৎপাদক’।

একেবারে প্রথম দিকে আদিম সমাজের মানুষ খাদ্য এবং বাসস্থানের ব্যপারে সম্পূর্ণটাই নির্ভর করতো প্রকৃতির উপর। বস্ত্রের ব্যপারটি তখনও আসেনি, সেটা যোগ হয় আরো পরে। আর বসবাস করতো প্রকৃতির কোলে তথা পাহাড়ের গুহা বা এরকম কোন স্থানে। অর্থাৎ আদিম সমাজের মানুষেরা বনজঙ্গল থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে বা পশু শিকার করেই খাদ্যের চাহিদা মেটাতো। এ পর্যায়ে আদিম সমাজের সেই মানুষগুলো ছিল খাদ্য সংগ্রাহক।

এরপরের স্তরে মানুষ খাদ্য সংগ্রাহক থেকে খাদ্য উৎপাদকে পরিণত হয়। এর পেছনের ইতিহাসটা গড়ে উঠে নারীদের হাত ধরে। আদিম সমাজের লোকজন বনজঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে আনা পরিপক্ব ফলমূল খেয়ে সেগুলোর বীজ স্বভাবসুলভ ভাবেই বাড়ীর আশেপাশে ছুড়ে ফেলে দিত। পরবর্তীতে তারা একটা জিনিস লক্ষ্য করলো যে, এসকল বীজ থেকে চারা গজিয়েছে। তারা এটাও ভাবলো যে, যদি এগুলোকে পরিচর্যা করা যায়, তাহলে নিশ্চয় সেগুলো তাদেরকে একসময় ফল প্রদান করবে। ফলশ্রুতিতে চারা গাছগুলোর যত্ন নেয়া শুরু হয় এবং পরিণত বয়সে সেগুলো ফল দিতে শুরু করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, চারা রোপন থেকে শুরু করে সেগুলোর পরিচর্যা সবকিছুই করতো বাড়ীর নারী সদস্যরা। যেহেতু পুরুষ সদস্যরা বাড়ীর বাইরে বনজঙ্গলে গিয়ে শিকারে ব্যস্ত থাকতো তাই নারী সদস্যরাই হয়ে উঠেছিল সেই সকল ফলবান বৃক্ষের রক্ষক। এভাবেই নারীর হাত ধরে কৃষির গোড়াপত্তন হয়। কালক্রমে এই চাষাবাদ আরো একটু উন্নতি লাভ করে। এ পর্যায়ে এসে তারা আরো বড় জমিতে অন্যান্য শস্য চাষাবাদ শুরু করে। ফলে সে সব ফসল সংগ্রহ করার পর তাদের বেশ কিছুদিনের খাদ্যের জোগাড় হয়ে যায়। এভাবে মানব সমাজ খাদ্য সংগ্রাহক থেকে খাদ্য উৎপাদকে পরিণত হয়।

খাদ্য উৎপাদকে পরিণত হওয়ার পর আসল খেলাটা শুরু হলো। যেহেতু সে সকল মানুষের হাতে তখন বেশ কিছুদিনের খাবার মজুদ আছে, সেহেতু তাদের আর আপাতত খাদ্য সংগ্রহের জন্য বাইরে যেতে হলোনা। ফলে গুহাবসী এই মানুষগুলো নিজ আবাসস্থলে শুয়ে বসে থাকার ফুরসত পেলো। এই অবসরে তারা নিজ গুহার দেয়ালে বা গুহার মেঝেতে কোনকিছুর সাহায্যে বিভিন্ন পশুপাখি বা লতাপাতার ছবি আঁকিবুঁকি করতে লাগলো। যেখান থেকে সৃষ্টি হলো গুহাচিত্রের। এছাড়াও অবসরে তারা নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সংকেত বা চিহ্ন ব্যবহার করতে শুরু করে। যা পরবর্তীকালে চিত্রভিত্তিক বর্ণমালা হিসেবে পরিচিত লাভ করে। যেমন মিশরীয় বর্ণমালা ‘হায়ারেগ্লিফিক’ প্রথমদিকে ছিলো চিত্রভিত্তিক। আস্তে আস্তে এই সকল মানুষেরা একের পর এক সভ্যতার বিভিন্ন অনুষংগ সৃষ্টি করে সভ্যতাকে বেগবান করেছে।

তাহলে বিষয়টি সরলীকরণ করলে এটা দাঁড়ায় যে, মানুষ যখন তার ব্যস্ততার অবসান ঘটিয়ে অবসরে থাকে তখন সে তার মস্তিষ্ক কে চিন্তার জন্য বিস্তৃত করতে পারে। পক্ষান্তরে কর্মব্যস্ত জীবনে যখন দু’দন্ড বিশ্রাম নেবার সুযোগ হয়ে উঠেনা তখন সেই মস্তিষ্ক দ্বারা সুকুমার বৃত্তির চর্চা সম্ভব হয় না। এমনকি ক্ষুধার পেটেও সুকুমার বৃত্তির চর্চা হয় না। কাউকে যদি সারাক্ষণ খাবারের খোঁজে ব্যস্ত থাকতে হয় তাহলে তার পক্ষে সৃজনশীল কোন চিন্তা করার এবং তার বাস্তবায়ন ঘটানো উভয়ই অসম্ভব। এ জন্যই হয়তো কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন,

“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,
পুর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”।

এবার ফিরে আসি আমার কাছে, লকডাউনের আগে সাপ্তাহিক বা বিশেষ ছুটি ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই চাকুরীর সুবাদে কর্মব্যস্ত দিন পার করতে হয় আমাকে (এটাও এক অর্থে পেট চালানোর জন্যই)। এভাবে একটানা অখণ্ড অবসর ইতঃপূর্বে কখনো ছিল না। ফলে মস্তিষ্কও খুব একটা চিন্তা করার ফুরসত পায়নি বোধহয়, এখন যেটা পাচ্ছে। তাই হয়তো মস্তিষ্কে উদ্ভূত চিন্তা কলমের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে; তা সে যত নগন্যই হোক।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here