একে তো নাচুনি বুড়ি তার উপর আবার ঢোলের বাড়ি

0


লেখকঃ মো: সফর আলী
প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ,
রাজশাহী সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ।

গত কয়েক বছর ধরে বোরো মৌসুমে ঠিক সময়ে ধান কেটে ঘরে তোলা কৃষকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতবছর মাড় না ভাংগা ভাঁজহীন লুংগি পরে মাথায় গামছা বেঁধে ধানক্ষেতে কাস্তে ও ধানের আঁটি হাতে ঘর্মহীন সহাস্য বদন বিশিষ্ট কর্পোরেট কৃষকদের ফটো প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী ভালভাবেই অবলোকন করেছিল। যা হোক, গত মৌসুম যেভাবেই হোক গত হয়েছে। এরই মধ্যে এই মোসুমে করোনা এসে উপস্থিত হওয়ার দরুন চলমান লকডাউনে বিভিন্ন অঞ্চলে ধানকাটা শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে এই সংকট আরো বেশি।

উল্লেখ্য যে, দেশের হাওর অঞ্চলেই প্রথম ধানকাটা শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে সমগ্র দেশব্যাপী তা চলতে থাকে। এ অবস্থায় ঠিকঠাক মত ধান ঘরে না তুলতে পারলে দেশে বড় ধরণের খাদ্য-সংকট দেখা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ ধারণা করছেন। বিদ্যমান বাস্তবতা অনুধাবন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন “একটি জমিও যাতে অনাবাদি পড়ে না থাকে”। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ স্ব স্ব ইউনিটে বিপদগ্রস্ত কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ধানকেটে ঘরে তুলতে সহায়তা করেছে। অতি সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের এহেন স্বেচ্ছাশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। নাচুনী বুড়ির নাচনটার শুরু মূলত এর পর থেকেই। “কেহ কেহ সফেদ পাঞ্জাবি আর পাজামার সাথে বহুমূল্যে পাদুকা সমেত কালো রং এর বিশেষ কোট পরিধান করিয়া কোমল হস্তে কাস্তে ধারণ করিয়া ধানক্ষেতে নামিয়া গেলেন ধান কাটিতে। কেহ আবার চর্মচক্ষু হইতে রংগিন ঠুলিখানা অপসারণ না করিয়াই ধান কাটা অব্যাহত রাখিলেন, ফলশ্রুতিতে পাকা ধান আর কাঁচা ধানের প্রভেদ না বুঝিয়ায় কাঁচা ধান কাটিয়া ফেলিলেন”।

প্রায় সমগ্র দেশ লকডাউনে থাকার ফলে বহুজন দীর্ঘসময় ধরে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন বঞ্চিত হয়ে যে সময় ঘরে বসে ছটফট করছিলেন, ঠিক সে সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছাত্রলীগের প্রতি যে স্তুতিবাক্য প্রকাশ করলেন তাতেই যেন ঢোলের বাড়ি পড়লো, নাচুনী বুড়িদের নাচন-কোদন আর আটকায় কে? শুরু হলো পৃথিবীর আদি ও অকৃত্রিম পেশার সাথে নজিরবিহীন মশকরা।

আমি পরোক্ষভাবে হলেও কৃষক পরিবারের সন্তান। পরোক্ষ বললাল এই কারণেই যে, আমাদের কৃষি জমি থাকলেও সেগুলো প্রত্যক্ষভাবে কখনো চাষাবাদ করা হয়নি। কিন্তু কৃষকদের কৃষি কাজের প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে আমি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। শুধু ধানকাটা নয়, যে কোন ফসলের ক্ষেত্রেই জমি চাষ থেকে শুরু করে বীজ রোপন, গাছের পরিচর্যাসহ সবশেষে তা গোলায় তোলা পর্যন্ত সকল কর্মকাণ্ড কৃষকরা করে থাকে তাদের নিজস্ব স্টাইলে। পানবরজ থেকে পান সংগ্রহ করার (পান ভাংগা বলা হয়) যেমন নিজস্ব ধরন আছে, তেমনি ধানক্ষেত থেকে ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার নিজস্ব স্টাইল আছে। আমি বা আপনি চাইলেই বরজ থেকে পান বা ক্ষেত থেকে ধান ফ্যাশনেবল ভাবে তুলতে পারবো না। ফসলের মাঠে স্টাইল আর ফ্যাশনে কৃষকই হিট।

পৃথিবীর আদি ও অকৃত্রিম পেশা নিয়ে এহেন নির্লজ্জ নাচন-কোদন বন্ধ হোক।

ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ধন্যবাদ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। অন্যদের জন্য ধন্যবাদ তোলা রইলো যোগ্যতা প্রমাণ সাপেক্ষে সেগুলো তাদেরকে যথাসময়ে যথাযথভাবে প্রদান করা হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here