করোনার ভয়াল থাবায় কাবু হয়ে পড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবার

0


জসিম ভূঁইয়া,সময় সংবাদ বিডি-ঢাকা:চাকরি থাকলে বেতন নেই। করোনার ভয়াল থাবার প্রভাবে কাবু হয়ে পড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ মানুষগুলো।

সম্প্রতি সারা বিশ্বজুড়ে চলমান এই পরিস্থিতিতে, করোনার ভয়াল থাবায় বদলে গেছে জনজীবন ও সাধারণ মানুষের চিন্তা ধারা। বাস্তবতার এই জীবনযুদ্ধে সপরিবার নিয়ে, দেশে গত তিন মাস ধরে ঘরে বসে জমানো সঞ্চয় খেয়ে, এখন প্রায় কাবু হয়ে পড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ মানুষ গুলো।

ইদানিং দেশজুড়ে অনেক প্রতিষ্ঠানেই দেখা যায়, চাকরি আছে তো বেতন নেই। সব মিলিয়ে বেশ হতাশায় জীবনযাপন করছেন মধ্যবিত্ত পরিবার। এক দিকে যেমন নেই, আয়-রোজগারের পথ সঙ্কুচিত অন্য দিকে বাড়ছে নানামুখী ব্যয় এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

বিশেষ করে শহর-নগরে বসবাসকারী মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে রীতিমতো চলছে হাহাকার । বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই চাকরি হারাচ্ছেন। যাদের চাকরি আছে তারাও ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। যারা বেতন পাচ্ছেন তারাও পুরো বেতন পাচ্ছেন না।

আর যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে সংসার চালান, এমত অবস্থায় তাদেরও আয়-রোজগার নেই বললেই চলে। অথচ বাসা ভাড়াসহ দৈনন্দিন সব খরচই দিনদিন বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে হতাশা আর নিরাপত্তাহীনতা। জীবনের শেষ পুঁজিটুকু ভেঙে খাচ্ছে অধিকাংশ পরিবারের মানুষগুলো এখন।

ঢাকা শহর জুড়ে, বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, করোনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনচক্রকে ওলটপালট করে দিয়েছেন। অদৃশ্য এ অণুজীবের সংক্রমণে শরীরের মতো জনজীবনও আজ বিপর্যস্ত। সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়ায় অনেকের জীবনে এখন দুর্দিন চলছে। এ অবস্থায় প্রতিনিয়ত তাদের সময় কাটছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠার মধ্যে।

সত্যি বলতে, এক প্রকার বাধ্য হয়েই বেশির ভাগ মানুষ বর্তমানে গৃহবন্দী থাকায় দিশেহারাই শুধু নয়, কর্মহীনতার চরম সঙ্কটেও আবর্তিত বটে, এতে মধ্যবিত্ত আর নিম্নশ্রেণীর মানুষের জীবন বিপন্ন প্রায়। রুজি রোজগারে আসছে এক অশনি সঙ্কেত।অনেকে অভাবে থেকেও মুখ ফুটে কারো কাছে বলতে পারছেন না। লজ্জায় হাত পাততে না পেরে তারা পরিবার নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। কবে এই দুঃসময় অতিক্রম করা যাবে তেমন আশ্বাসও কেউ দিতে পারছে না।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপে দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে দেশে নিম্নবিত্তের আয় ৭৫ ভাগ কমেছে। আগের তুলনায় চরম দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে ৬০ ভাগ। জরিপ সূত্র অনুযায়ী, তাদের ৭২ শতাংশের কাজ কমে গেছে, নয়তো তারা আয়ের সুযোগ হারিয়েছেন। আট ভাগের কাজ থাকলেও মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে কোনো খাবার নেই। ২৯ ভাগের ঘরে আছে এক থেকে তিন দিনের খাবার। সরকারের জরুরি ত্রাণ পৌঁছেছে মাত্র চার শতাংশ মানুষের কাছে। ৬৪ জেলার দুই হাজার ৬৭৫ জনের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে অংশগ্রহণকারীদের ৮৯ ভাগই চরম বা হতদরিদ্রের স্তরে নেমে গেছেন।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকার, প্রশাসন ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা দিয়ে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তা, চাহিদার তুলনায় এসব খুবই কম, বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা । তা ছাড়া সব পক্ষের লোকেরা এ সহায়তা পাচ্ছেন না। কিছু বিত্তবান মানুষ সীমিত আকারে নিজ উদ্যোগে ত্রাণকার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাতে প্রয়োজনের খুব সামান্য অংশই পূরণ হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, যারা এতদিন স্বল্প আয় দিয়েই স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতেন, তারা পড়েছেন বের্কায়দায়। বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংসার চালাতে তাদের প্রতিনিয়ত এই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

অন্যদিকে,ঢাকা শহরের বেশ কিছু এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাকরি হারানো বা আয় কমে যাওয়া অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এখন ঠিক এই মুহূর্তে এমন অবস্থায় বাড়িওয়ালারও কঠোর রোষাণলে চাপের মুখে পড়ছেন। বিভিন্ন এলাকায় সময়মতো বাড়ি ভাড়া দিতে না পারায় মালিকদের দুর্ব্যবহারই শুধু নয়, ঘর থেকে বের করে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। বাধ্য হয়ে অনেকে আসবাবপত্র ফেলে রাতের অন্ধকারে বাসা থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ি। ঢাকা শহরে,অধিকাংশ ফ্লাট বাড়িতেই এখন ঝুলছে, টু’ লেট ‘নেই ভাড়াটিয়া।

ইতিমধ্যে প্রায় ৫০, হাজার ভাড়াটিয়া ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি পাড়ি জমিয়েছেন। আবার অনেকেই পরিবার জীবিকা জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকতে হবে বলে হাজার চেষ্টা করার পরেও মিলছে না আশ্রয় আত্মীয় স্বজনের বাসায়, মানুষের বাধায় যেতে পারছেন না গ্রামের বাড়ি ও।

অন্য দিকে, বাড়ি ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল কিছু বোধসম্পন্ন পরিবার পড়েছে ভিন্নধরনের সমস্যায়। করোনাকাল বিবেচনায় কঠোর হতে না পেরে নিম্নআয়ের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে ভাড়া তুলতে পারছেন না। মানবিক বিবেচনায় তাদের বের করেও দিতে পারছেন না। আবার দৈনন্দিন ব্যয় তাকে ঠিকই নির্বাহ করতে হচ্ছে। পানি-গ্যাস-বিদ্যুতের বিল বকেয়া বাড়ছে। নিজের পাশাপাশি ভাড়াটিয়াদের ইউটিলিটিও চালু রাখতে হচ্ছে। ব্যাংক কিস্তির বকেয়া এবং দায়দেনার পরিমাণ বাড়ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা, কবে নাগাদ করোনার এই মহামারী থেকে মুক্তি মিলবে তাও অনুমান করতে পারছেন না কেউই। শ্বাসরুদ্ধকর এই পরিস্থিতিতে কোনোমতে জীবন পার করে,দিন কাটাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ মানুষগুলো।

তাছাড়া,করোনা এই পরিস্থিতিতে দেশের বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে আরেক কঠিন কষ্টে সময় পার করছেন শিক্ষিত বেকার যুবকরা।শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরি না পেয়ে টিউশনি বা পার্টটাইম চাকরি করে আগে কোনোমতে চললেও এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ১৫ লাখ বেকার যুবক দেশের এমন পরিস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়েছেন।

তাদের জন্য নেই ,কোনো ত্রাণ বরাদ্দ। আবার কারো কাছে হাত পাততেও পারছেন না তারা। তাই অর্ধাহারে-অনাহারে দিন পার করছেন অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক। অনেকে সেশনজটের কবলে জীবনের মূল্যবান চার থেকে পাঁচ বছর হারিয়েছেন। এ কারণে সরকারি চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা। তাই টিউশনি করে বা কেউ পার্টটাইম চাকরি করে অনেক কষ্টে দিন পার করতেন হচ্ছে তাদের ও। কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি বিপরীতে কমেছে আয়। সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে তারা কীভাবে জীবনযাপন করবেন, তা নিয়েও ভাবতে হবে। কারণ এদের সঞ্চয়ও খুব বেশি থাকে না। কিন্তু মধ্যবিত্তদের নিয়ে ভাবছেন কে? অবস্থা এমন যে, এই শ্রেণির বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না।

এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে, দেশ জুড়ে আজ দিশেহারা মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ মানুষ গুলো। এক কথায় করোনার এই চরম দুর্যোগে অসহায় আজ মধ্যবিত্ত পরিবার। সর্বস্ব ব্যথা  যেন, কোন অংশেই কম নয়। তাই অর্থনীতির গতিধারায় এই মধ্যবিত্তদের স্বার্থ সংরক্ষণ নিয়ে আলাদা করে ভাবার সময় এসেছে এখন।

তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে বাস্তবতা ও চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে, মধ্যবিত্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াই। নিজে বাঁচি অন্যকে বাচাই, নিজ নিজ জায়গা থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই। সর্বদা হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি -সবার প্রয়োজনের মুখে। সকলের কাছে এই প্রত্যাশা রইলো।

লেখক: জসিম ভূঁইয়া।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here