বিনিময়ের ৫ বছর, কষ্ট ভুলে পাল্টে গেছে ছিটমহলবাসীর জীবন

0


নিজস্ব প্রতিবেদক, সময় সংবাদ বিডি:
ছিটমহলের বিলুপ্তির পর উন্নয়ন ও মানুষের কঠোর পরিশ্রমে পাল্টে গেছে দাসিয়ারছড়ার মানুষের জীবন। ছিটমহল এখন তাদের জন্য শুধু ইতিহাস ও স্মৃতি। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ-ভারত মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তির বাস্তাবায়নের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনার পর ১৬২টি ছিটমহল একীভূত হলে নাগরিকরা পছন্দমত দেশের হতে পারেন। ঐতিহাসিক দিনটির ছয় বছরে পদার্পণ উপলক্ষে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার চলছে সাজসাজ রব। নানা অনুষ্ঠান করার কথা থাকলেও প্রাণণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে তা কাটছাঁট করা হয়েছে।

কর্মসূচিতে রয়েছে- শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা, রাত ১২টা ১ মিনিটে ৬৮টি মোমবাতি জ্বালানো শেষে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ। এছাড়াও রাতে দাসিয়ারছড়ার প্রতিটি বাড়িতে আলোকসজ্জ্বাসহ শনিবার আয়োজন করা হয়েছে হা-ডু-ডু খেলা। পাশাপাশি মসজিদে মসজিদে হবে মিলাদ মাহফিল আর মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা। ছিটমহল বিনিময়ের ৫ বছর পূর্তিতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রাপ্তিতে মহাখুশি বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা।

ফুলবাড়ী উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ বছরে প্রায় ২২ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা হয় দাসিয়ারছড়া উন্নয়নে। এর মধ্যে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডির মাধ্যমে ২৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কমিউনিটি রির্সোস সেন্টার, ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি মসজিদ, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মন্দির, দুই কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি হত দরিদ্র পরিবারের বসতবাড়ী নির্মাণ, ২২ কিলোমিটার পাকা সড়ক, দুস্থ পরিবারে স্যানিটারি ল্যাট্রিন স্থাপন, দুঃস্থ পরিবারে নলকূপ স্থাপন, একটি করে শ্মশান ঘাট, শহীদ মিনার, নীলকমল নদীতে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ, ১৫ মিটার দৈর্ঘের চারটি ব্রিজ/কালর্ভাট নির্মাণ, ৭৮২ জন বয়স্ক ভাতা, ৩৩৯ জন বিধবা ভাতা, ৫১৫ জন প্রতিবন্ধী ভাতা, বিশুদ্ধ পানীয় সরবরাহের জন্য ৪ টি নলকুপ স্থাপন, এক হাজার ৮৫৯ জনকে ভিজিডি কার্ড, মাতৃত্বকালিন ভাতা দুইশ জনকে, সেলাই মেশিন ৫৫ জনকে, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে ৩৬০ জনকে মোট ২৪ লাখ ২৩ হাজার টাকার ঋণ প্রদান, ৫০০ হতদরিদ্র পরিবারকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা, একটি নি¤œ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি কলেজের একাডেমিক স্বীকৃতি। এছাড়াও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা দাখিল মাদরাসা নামে একটি মাদরাসা সাম্প্রতি সময়ে সরকার জাতীয়করণ ঘোষণা করেছেন। সেই সঙ্গে দীর্ঘ ৬৮ বছর পিছিয়ে থাকা বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্বিতল ডিজিটাল সার্ভিস ইমপ্লয়েন্টমেন্ট এন্ড ট্রেনিং সেন্টার মুজিব বর্ষে উপহার দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ভূমি জটিলতার বিষয়টি সম্পুর্ণভাবে নিরসন হয়ে গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন এক হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর ও সরকারি খাস খতিয়ান ভুক্ত ৯ একর জমির প্রাক জরিপ শেষ করে খতিয়ান হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত কল্পে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। দাসিয়ারছড়াসহ বিলুপ্ত ছিটমহলে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির ৭৫ দিনের মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৫৬২ পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনো বাড়িই বিদ্যুৎ বিহীন নেই। দেওয়া হয়েছে দ্রুত গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। ডিজিটাল সাব সেন্টার থেকে স্বল্পমূল্যে দেওয়া হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির সেবা। ইউনিসেফের অর্থায়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি স্থাপন করেছে ১৫টি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে ১৪টি মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্র। উপজেলা কৃষি অফিসার অর্থায়নে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে। দাসিয়ারছড়ায় ঘরে ঘরে সুপেয় পানি আর স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বেকার যুব ও যুব মহিলাদের দেয়া হয়েছে নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ। দুই হাজার ১৬০ জন নারী-পুরুষকে স্বাক্ষরতার আওয়াতায় আনা হয়েছে।

বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের অধিবাসী মোজাফ্ফর হোসেন,নুর আলম ,মনিরুজ্জামান ও তানিয়া বেগম জানান, চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৬৮ বছরে আমাদের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটেছে। মূল ভূ-খন্ডে যুক্ত হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমান সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুত, রাস্তা ঘাট, ব্রীজ কালভাট, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ দাসিয়ারছড়ায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ডের বিল্পব ঘটেছে। আমরা কখনো কল্পনা করিনি সরকার এতো দ্রুত দাসিয়ারছড়ায় উন্নয়ন করবে। সরকারের কাছে দাসিয়ারছড়াবাসী চির ঋণি। সরকারের কাছে দাসিয়ারছড়াবাসীর শেষ দাবি, দাসিয়ারছড়াকে একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন ঘোষণা করা হোক।

এ প্রসঙ্গে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার তৌহিদুর রহমান বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর। গত পাঁচ বছরে সরকার প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুত, ক্লিনিক, একটি সরকারী মাদ্রাসা ,স্কুল –কলেজ, রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ-কালভাটসহ সব সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। সরকারের এ উন্নয়ন দাসিয়ারছড়ায় চলমান থাকবে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্য রাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি’র বাস্তবায়ন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই দিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১ টি ছিটমহল দুই-দেশের ভু-খন্ডে যুক্ত হয়। দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনার পর ১৬২টি ছিটমহল একীভূত হলে এর অীধবাসিরা নাগরিকত্ব লাভ করেন ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here