কেন মানুষ তার প্রিয়জনের সাথে মিথ্যে বলে?

0


জসিম ভুঁইয়া,সময় সংবাদ বিডি-ঢাকা: জীবনে চলার পথে মিথ্যে বলা কি খুব জরুরী ? মিথ্যাচার,ও মিথ্যা কথা”বর্তমান মানবজাতির ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মিথ্যাচার মানুষের মনোজগতে গভীরভাবে প্রোথিত এক বৈশিষ্ট্য। বেশিরভাগ মানুষই জীবনের কোন না কোন সময় কম-বেশি মিথ্যার আশ্রয় নেয়।

মিথ্যে কথার আশ্রয় পৃথিবীর কত শতাংশ মানুষ নেয়-এবং সারাদিনে মিথ্যা কথা কতবার বলে,এই বিষয়ে জরিপ চালিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। এর একমাত্র কারণ-হচ্ছে, একজন মানুষ তার প্রিয় বন্ধু,বান্ধবী,আত্মীয় কাজিন কিংবা প্রিয় জনের সাথে মিথ্যে বলছেন,এবং বেশিভাগ সময় মিথ্যে কথা বলার সময় লোকসমাগমও মানুষের উপস্থিতি খুব কমই থাকে। অর্থাৎ তৃতীয় কিংবা চতুর্থ ব্যক্তি উপস্থিতি না থাকায় প্রথম ব্যক্তির মিথ্যে বলার সুযোগ টা বেশি পাচ্ছেন। প্রথম ব্যক্তির মিথ্যা কথাগুলো দ্বিতীয় ব্যক্তি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করছে। সুতরাং একে অপরকে মিথ্যে বলছে দুজনে শুনছেন তৃতীয় কোন ব্যক্তি উপস্থিত না থাকার কারণেই, এই মিথ্যে কথা বলার উপরে জরিপ চালিয়ে গবেষকরা -এর মাপকাঠি কিংবা- সুস্পষ্ট কোন ধারণা খুঁজে পায়নি।

মনোবিজ্ঞানী ও ইউরোপিয়ান গবেষক বলেছেন,জন্ম থেকে বড় হয়ে যে কেউ প্রকৃতপক্ষে একটি যোগ্যতর অবস্থানে পৌঁছাতে চায় মানুষ যেখান থেকে সে জীবন ও জীবিকার জন্য নিজেকে সক্ষম ও যোগ্য কর্মীতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে,কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ ও পদবী থাকলেও প্রত্যেকেই জীবিকার প্রশ্নে একজন আর্দশ ও পারদর্শী কর্মী হতে উঠতে চায়। এবং তারই ধারাবাহিকতায় নিজের স্বপ্নের গন্তব্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সাফল্য লক্ষ্যে নিজগন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য কম বেশি মিথ্যা বলে থাকেন, তবে হ্যাঁ মিথ্যা কথা জীবনে বলেন নি এরকম খুব কম লোকই আছে পৃথিবীতে। নিজের মনের অজান্তে হলোও একটি মিথ্যা বলেছেন।

মিথ্যা কথা বলা মানে,নিজের সঙ্গেই বৈপরীত্য সৃষ্টি করা। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিজেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ২২ শতাংশ লোক ভুলত্রুটি বা অপকর্মকে ধামাচাপা দিতে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং ১৪ শতাংশ লোক অন্যদের এড়িয়ে চলে বা অন্যদের থেকে পালিয়ে বেড়ায়। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্য যেখানে কাজ করে সেখানে ১৬ শতাংশ লোক আর্থিক সুবিধা আদায়ের জন্য এবং ১৫ শতাংশ লোক অর্থবহির্ভূত সুবিধা লাভের জন্য মিথ্যাকে আশ্রয় করে। ৭ শতাংশ লোক কি উদ্দেশ্যে মিথ্যাচার করে তা স্পষ্ট নয়,এমনকি নিজেদের কাছেও নয়। অন্যদের নানাভাবে প্রভাবিত করার জন্য মিথ্যাচার করে ১১ শতাংশ লোক।

মজা করা বা অন্যদের হাসানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে ৫ শতাংশ মানুষ। নিজেদের সম্পর্কে একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে মিথ্যাচার করে ৮ শতাংশ মানুষ। বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার বা অগ্রাহ্য করার জন্য মিথ্যাচার করে ২ শতাংশ মানুষ।

সম্প্রতি ইতিহাসের পাতায় মিথ্যাচারের অনেক বড় বড় ও ঐতিহাসিক ঘটনা আছে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে নিজের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে,চরম মিথ্যাচার করেছিলেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে তার কখনও যৌন সম্পর্ক হয়নি এটা ছিল, বিল ক্লিনটনের ডাহা মিথ্যাচার,যা ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে সেই সময়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনেক মিথ্যাচারও আজ সর্বজনবিদিত,যাহা আমাদের কমবেশি সবার জানা।

জ্যাকব হল নামে এক আমেরিকান,সারা জীবন অসংখ্য মিথ্যা কথা বলার জন্য বেশকিছু দিন আগে-ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সবচেয়ে বড় মিথ্যুক খেতাব এবং সেইসঙ্গে একটি সোনালী বেলচা পেয়েছেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য মিথ্যা- কথার জন্য মানুষ পুরস্কৃত হয়। কিন্তু ইসলাম ধর্মে মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ। প্রতিটা মুহূর্তেই আপনি”আমি’ আমরা,মিথ্যা কথা আশ্রয় নিয়ে হচ্ছি মহা পাপের ভাগীদার হচ্ছি।

বিবেচনা করলে দেখা যায়,একজন মানুষ যে ইচ্ছে করেই সবসময় মিথ্যা বলি তা নয়।কখনো কেউ ভুলে মিথ্যা বলে,কখনো অনিচ্ছা সত্ত্বে মিথ্যা বলে। প্রিয়জনের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ও পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে মিথ্যা বলতে হয়। এক কথায়,বর্তমান সমাজে আমাদের জীবনের যাবতীয় ঝামেলা থেকে তাৎক্ষণিক ও সহজে মুক্তি পাওয়ার জন্যে আমি,আপনি আমরা,মিথ্যা বলে ফেলি।

কখন,কার সঙ্গে,কেন এবং কিভাবে মিথ্যা কথা বলেছি,তা ভাবলেই আমরা আমাদের মিথ্যা বলার কারণ জানতে পারবো। অনেকে মিথ্যা বলে নিজেকে খুব চালাক ভাবেন। মিথ্যা বলে অন্যকে ঠকাতে পারলে এক ধরনের আনন্দ ও তৃপ্তি পান। এক্ষেত্রে বলা যায় মিথ্যা বলা এক ধরনের মানসিক সমস্যা। অবচেতন মনেই মিথ্যাটা বার বার চলে আসে। অন্যদিকে,পারিবারিক বা সামাজিক কারণে ছোটবেলা থেকেই মনের অজান্তে মিথ্যা বলার বদ অভ্যাস গড়ে ওঠে অনেক মানুষের মাঝে।

সমাজে এরকম অনেকেই আছেন,প্রিয়জন বা আপনজনদের কাছে নিজেকে অনেক যোগ্য,দক্ষ,স্মার্ট,সৎ ও ভালো হিসাবে প্রকাশ করার জন্যে অনেকে মিথ্যা বলে। অন্যের সাথে তুলনা করার পর যদি নিজেকে ছোট মনে হয়,তখন নিজেকে বড় হিসাবে উপস্থাপন করার জন্যে মিথ্যা বলেন। অর্থাৎ, নিজের হীনমন্যতাকে চাপা দেওয়ার জন্যে মিথ্যা কথা বলার প্রয়োজন হয়।

গবেষকদের মতে,মিথ্যা বলার এই আচরণের উৎপত্তি ভাষার আবির্ভাবের খুব বেশি পরে না । মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে উদ্দেশ্য হাসিলের এই ক্ষমতাটা সম্পদ ও সঙ্গী/সঙ্গিনী প্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছিল। ক্ষমতা লাভের অন্যান্য উপায়ের তুলনায় মিথ্যাচার এক সহজ কৌশল বলে মনে করছেন তারা।

মিথ্যা বলা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে ঐ মানুষকে চিহ্নিত করুন যাদের সঙ্গে আমরা বেশি মিথ্যা বলি। এই যেমন অফিসের বস, অথবা আপনার জীবনে সঙ্গী বা বন্ধুর সঙ্গে বেশি মিথ্যা কথা বলা হয়। তাদের যত মিথ্যা বলা হয়েছে তা স্মরণ করুন। সবচেয়ে ছোট মিথ্যাটি ছিলো খুঁজে বের করুন। এরপর তাদের কাছে সবচেয়ে ছোট মিথ্যা কথাটি স্বীকার করে দেখুন একবার।

এভাবে আস্তে আস্তে ছোট থেকে বড় মিথ্যা কথাগুলো স্বীকার করতে থাকবেন, মিথ্যা এড়িয়ে যেতে থাকবে আপনার জীবনে থেকে দেখবেন মিথ্যার অভ্যাস চলে গেছে। এবং আপনি সদা সত্যের জগতে পা বাড়িয়ে দিয়েছেন এটাই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

একজন মানুষ যত বেশি নিজের হীনমন্যতা দূর করতে পারেন,তিনি তত বেশি সত্য কথা বলতে পারেন। সত্য হলো সুখের মূলমন্ত্র,আর মিথ্যা হলো যন্ত্রণা ও হতাশার কারণ। তাই আর মিথ্যা নয়। লেখক:-জসিম ভুঁইয়া। ব্যবস্থাপনা পরিচালক সময় সংবাদ বিডি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here