ফাহিম সালেহর হত্যাকারী আটক,রোববার জানাজা

0


ফিরোজ চাষী,সময় সংবাদ বিডি-ঢাকা:বাংলাদেশের রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম পাঠাও-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহ হত্যার সন্দেহভাজন হিসেবে তার ব্যক্তিগত সহকারীকে গ্রেফতার করেছে নিউ ইয়র্ক পুলিশ। প্রাথমিক পুলিশ ধারণা করছে টাকার লেনদেন সংক্রান্ত কারণেই এ তরুণ প্রযুক্তিবিদকে খুন করা হয়।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) এ খবর জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও নিউ ইয়র্ক টাইমস। পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে,ফাহিম সালেহর ২১ বছর বয়সী সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী টাইরেস ডেভন হাসপিল ১০ হাজার ডলার আত্বসাৎ করার পর ফাহিমকে হত্যা করেছেন বলে ধারণা করছে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া নিউইয়র্কের গোয়েন্দা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন বলেও জানা যায়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে- রোববার (১৯ জুলাই) ফাহিমের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। গোয়েন্দারা হত্যার মোটিভ দেখে ধারণা করছেন,ফাহিম এ অর্থচুরির বিষয়টি জেনে যান। কিন্তু তিনি পুলিশকে না জানিয়ে বরং আফ্রো-আমেরিকান সহকারী হাসপিলকে অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দেন। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের কিছু প্রমাণ মিলেছে।

তদন্তকারীরা সংবাদ সম্মেলনে জানান,ফাহিমকে খুন করা হয়েছে সোমবার (১৩ জুলাই)। আর ম্যানহাটনে ২২ লাখ ডলারে কেনা তার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে মরদেহ পাওয়া যায় পরদিন মঙ্গলবার (১৪ জুলাই)। তারা আরো বলছেন,ফাহিমের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেই হত্যাকারী হাসপিল হত্যার স্থান পরিষ্কার করার জন্য উপকরণ কেনেন। পরের দিন তিনি আবার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে মরদেহ ইলেকট্রিক করাত দিয়ে খন্ড বিখন্ড করেন এবং স্থানটি পরিষ্কার করেন।

গোয়েন্দারা বলছেন,হত্যাকারী তিন পিসের কালো স্যুট পড়েন। মুখেও ছিল কালো মাস্ক। বহন করছিলেন একটি ডুফেল ব্যাগ। লিফট ও তার বিল্ডিংয়েও তিনি ফাহিমকে অনুসরণ করেন। পরে ঘরে ঢুকে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। লিফটের ভিতরে থাকা ক্যামেরায় দেখা গেছে হত্যাকারী তার অবস্থানের চিহ্ন মুছতে ব্যাটারিচালিত একটি পোর্টেবল ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করেছেন।

এতে দেখা যায়,ভবনের লিফট দিয়ে ৭তলায় নিজ ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন ফাহিম। একই ফুটেজে, ফাহিমের সন্দেহভাজন খুনিকেও দেখা যায়। হাতে একটি প্লাষ্টিকের ব্যাগ নিয়ে ফাহিমের সঙ্গেই লিফটে ওঠেন আততায়ী।

খুনের আগে সোমবার (১৩ জুলাই) আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে দিকে ফাহিমকে একটি সিসিটিভি ক্যামেরাতে শেষবারের মতো দেখা যায়। এতে দেখা যায়,ভবনের লিফট দিয়ে সাততলায় নিজ ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন ফাহিম।

একই ফুটেজে,ফাহিমের সন্দেহভাজন খুনিকেও দেখা যায়। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজ, নিউ ইয়র্ক পোস্টসহ স্থানীয় বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে এমনটাই জানায়।নিউইয়র্ক সিটির সবচেয়ে নিরাপদ এলাকা এবং বিত্তশালীদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ম্যানহাটনের লোয়্যার ইস্ট সাইডের এপার্টমেন্ট থেকে এই তরুন উদ্যোক্তা ফাহিম সালেহ্ (৩৩)’র লাশ উদ্ধার হয়।

এ ঘটনার ৩দিন পর পুলিশ হত্যার মোটিভ উদঘাটনে সক্ষম হয়। পুলিশের অভিমত, প্রতিহিংসা পরায়নতার চরম প্রকাশ ঘটেছে এই হত্যাকান্ডে,এটি একটি পরিকল্পিত খুনের ঘটনা । পুলিশ এটিকে ‘খুবই কুৎসিত’ হত্যাকান্ড বলে আখ্যায়িত করেছে।

ফাহিমকে সেদিন ফোনে না পেয়ে তার খালাতো বোন ছুটে আসেন ঐ ভবনে। এরপর এপার্টমেন্টে গিয়ে ফাহিমের লাশ পলিথিন ব্যাগে দেখে আৎকে উঠেন। সাথে সাথে ফোন করেন ফাহিমের ছোটবোন রিফ-সালেহকে। রিফ পেশাগত কারণে ম্যানহাটনেই আলাদা বাসায় বসবাস করেন। চলে আসেন এবং এরই মধ্যে ৯১১ এ কল করা হয়।

দুই বেডরুমের বিলাসবহুল-সুপরিসর এপার্টমেন্টটি বছর খানেক আগে ২২ লাখ ডলারে ক্রয় করেন ফাহিম। জন জে হাই স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় ২০০৩ সালে শিশু-কিশোরদের জন্যে ওয়েবসাইটে ভিডিও গেম (উইজ টিন) তৈরী করায় বিপুল অর্থ আয়ে সক্ষম হন ফাহিম।

এভাবেই ২০০৫ সালে হাই স্কুল গ্রাজুয়েশনের পর বস্টন সিটি সংলগ্ন বেন্টলী ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং বিশেষ কৃতিত্বের সাথে ২০০৯ সালে গ্রাজুয়েশন করেন। ফাহিমের মা-বাবা ৩০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে সৌদি আরবে থাকতেন। সেখানেই ১৯৮৬ সালে জন্ম ফাহিমের। যুক্তরাষ্ট্রে এসে গোটা পরিবার উঠেছিলেন নিউইয়র্কের রচেস্টার সিটিতে। সেখানেই তার বেড়ে উঠা। লেখাপড়া করেছেন-ইনফরমেশন সিস্টেম নিয়ে। মা-বাবা আর বোনদের সাথেই থাকতেন।

সবসময় উদ্ভাবনী চিন্তায় নিবিষ্ট থাকায় বিয়ের কথা ভাবতে পারেননি ফাহিম। অর্থাৎ এই ৩৩ বছর বয়সেই নিজের উদ্ভাবিত মডেলের প্রচলন ঘটিয়ে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অধিক অর্থের মালিক হয়েছিলেন। প্রায় ১৫ ফাহিম এ কাজে যুক্ত ছিলো। সম্ভবত:এটাই কাল হয়েছিল উদিয়মান এই টেকনোলাজি জায়েন্টের।

ব্যবসায়ীক প্রতিপক্ষ ফাহিমের এই এগিয়ে চলা সহ্য করতে পারছিলেন না- এমন মন্তব্য করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রবাসী। তারা মনে করছেন,সাদা-মাটা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ফাহিম কখনোই কারো সাথে রেগে কথা বলেননি। রাগ করার সময়ই ছিল না তার। সবসময় নিজের মধ্যে নিবিষ্ট থাকতেন নতুন কিছু উদ্ভাবনের নেশায়।

ফাহিমের বন্ধু ও ব্যবসায়ীক পার্টনার আহমেদ ফাহাদ তার সম্পর্কে বলেছেন,তিনি ছিলেন সুন্দর ভবিষ্যত রচনায় রোল মডেল,যা ভালো মনে করতেন তা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা সংশয়ে থাকতেন না। তার সাহচর্যে যারাই এসেছেন,তারাই উদ্বুদ্ধ হয়েছেন জীবন-যুদ্ধে। ফাহিমের পেশাদার ঘাতক সোমবার বিকেলে ইলেভেটর দিয়ে ফাহিমের সাথেই সপ্তম তলায় উঠে। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ফাহিমকে হয়তো মাথায় আঘাত করে দুর্বল করা হতে পারে।

এরপরই বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে গলাকাটা হয়। দু’হাত ও দু’পা কাটা হয়। বুকের মধ্যেখানেও করাত চালিয়ে দু’ভাগ করা হয়। এরপর আলাদা পলিথিন ব্যাগে ভরা হয়। ফ্লোরের রক্ত মুছে ফেলা হয় কৌশলে। করাতেও ছিল না রক্তের দাগ। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা,ফাহিমকে হত্যার পর টুকরো টুকরো লাশ ঐ স্যুটকেসে ভরে কোথাও নেয়া হতো, যাতে ফাহিম নিখোঁজ রহস্য উদঘাটনেও অনেক সময় পেড়িয়ে যায়।

তদন্ত কর্মকর্তা এবং এমন হত্যাকান্ডের ওপর গভীর পর্যবেক্ষণকারীরা আরো মনে করছেন, লাশ স্যুটকেসে ভরার আগেই হয়তো ঐ এপার্টমেন্টে আসতে আগ্রহী কেউ নীচে থেকে কলিং বেল টিপেছিলেন। সে শব্দেই ঘাতক সবকিছু ফেলে পালিয়েছে। এমন ভাবনার সারাংশ টেনে ফাহিমের অভিভাবকরা বলেছেন,ঘাতক কিভাবে ভবন থেকে পালালো-সেটিও জানতে হবে।কারণ,সে তো হাওয়া হয়ে যায়নি। যে পথে ঢুকেছিল-সেই পথেও বেড়িয়ে গেছে- সে দৃশ্য ফুটেজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন-এমন প্রশ্ন ক্ষুব্ধ প্রবাসীদের।

করোনার প্রকোপ শুরু হবার পর নিউইয়র্কসহ সমগ্র যুক্তরাষ্ট্র লকডাউনে যাবার সময়, মধ্য মার্চ থেকে দু’সপ্তাহ আগে পর্যন্ত সেই বাড়িতেই ছিলেন ফাহিম। লকডাউন শিথিল হওয়ায় ব্যবসায়িক যোগাযোগসহ প্রয়োজনীয় কাজ করতে নিজের কেনা ম্যানহাটানের এই লোয়্যার ইস্ট সাইডে সাফোক স্ট্রিটের ইস্ট হিউস্টন স্ট্রিটের ওপর লাক্সারি এপার্টমেন্টে ফিরেছিলেন।

ফাহিমের বাবা সালাউদ্দিন আহমেদ চট্টগ্রাম জেলার স›দ্বীপের হরিশপুর ইউনিয়নে জন্ম গ্রহন করেন। স›দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী এম এস সি সুলতান আহমেদ স›দ্বীপ মডেল হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক এম সুলতান মিয়ার দৌহিত্র ফাহিম।

ফাহিম সালেহর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে পাঠাও। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিপণন ও জনসংযোগ কর্মকর্তা সৈয়দা নাবিলা মাহবুব এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেন,পাঠাও এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ফাহিম সালেহের মৃত্যুতে আমরা হতভম্ব এবং গভীরভাবে দুঃখিত।

বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাইরেও মানুষের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তনে প্রযুক্তির সক্ষমতার প্রতি ফাহিমের গভীর বিশ্বাস ছিল। সে সবসময় পাঠাও এবং এই ইন্ডাস্ট্রির সবার জন্য এক অনুপ্রেরণা ছিল।

নিহত ফাহিম সালেহ বাংলাদেশের রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম পাঠাও ছাড়াও নাইজেরিয়াতে গোকাডা নামক আরেকটি রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম চালু করেন। কলম্বিয়ার রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম পিকাপ এর মালিকও তিনি। পেশায় ওয়েবসাইট ডেভেলপার ফাহিম সালেহ অ্যাডভেঞ্জার ক্যাপিটাল গ্লোবাল নামক একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানেরও উদ্যোক্তা ছিলেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here