বিশ্ব কী দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে?

0


লেখকঃ মো: সফর আলী
প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ,
রাজশাহী সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ।

“খুব সম্ভবত Cold War নতুন আংগিকে ও নতুন মাত্রায় নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে”।

কিছুদিন আগে এই শিরোনামে একটি স্ট্যাটাস আমি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম। আজকের এই লেখার মাধ্যমে মোটাদাগে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ করোনাকালে এসে স্নায়ুযুদ্ধের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার বিষয়টি ইতিহাসের আলোকে সাধ্যমত বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো।

দেশে দেশে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ থেকেই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার গোড়া পত্তন হয়। ইউরোপে ইতালি ও জার্মানির একত্রিকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং ক্রমেই তা বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে শক্তিশালী ভাবে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তীকালে কোন কোন দেশে জাতীয়তাবাদ উগ্র রূপ ধারণ করে। ফলে জাতি হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও শক্তিমত্তার প্রমান দিতে গিয়ে অনেক রাষ্ট্রই নিজেদেরকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে এবং অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

বিশ্বব্যাপী কখনো সেটা ভৌগোলিক সীমানা নিয়ে, কখনও জলপথের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, কখনো মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে, কখনো পারমাণবিক অস্ত্র বা মারণাস্ত্রের সংখ্যা ও পরিমাণ বৃদ্ধি নিয়ে। একেবারে হাল যুগে সেই প্রতিযোগিতার অংশরূপে একটি দ্বৈরথ শুরু হয়েছে বাণিজ্য বিস্তার নিয়ে। যার প্রধান দুই কুশীলব হচ্ছে Republic of China এবং United state of America। করোনা ইস্যূতে এই দ্বন্দ্ব এখন অনেকটাই স্নায়ুযুদ্ধের রূপ লাভ করেছে বলে অনেক বিশ্লেষকের সাথে সাথে আমিও মনে করছি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আস্তে আস্তে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু পুরাতন ধাঁচের উপনিবেশবাদের কবল থেকে মুক্ত হলেও স্নায়ুযুদ্ধত্তোর যুগে বিশ্ব পরিচিত হয় নয়া উপনিবেশবাদের সাথে। যেখানে ভৌগোলিকভাবে কোন রাষ্ট্রকে উপনিবেশ বানিয়ে তার ধনসম্পদ নিঃসরণের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বা তার আশপাশের অঞ্চলের অর্থনীতিকে কব্জা করার একটি প্রবণতা নয়া এই উপনিবেশবাদের বৈশিষ্ট।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মূলতঃ এই নয়া উপনিবেশবাদের সূচনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকের উপর হামলার মাধ্যমে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে প্রায় দুই দশককাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একক আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল। পরবর্তীকালে আরব বসন্তের সূত্রপাত হওয়ার পর এই সুযোগে ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কখনো পরোক্ষ আবার কখনো প্রত্যক্ষভাবে নাক গলানো শুরু করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলে একক আধিপত্যের অবসান হয়। এই পর্যায়ে এসে মনে হচ্ছিল স্নায়ুযুদ্ধ আবার বোধহয় নতুন রূপ ফিরে পেল। কিন্তু চমক তখনও বাকি ছিল। বর্তমান সময়ের বাণিজ্যিক পরাশক্তি চীন খুব সুকৌশলে বিশ্বব্যাপী তার বাণিজ্য বিস্তার করে আসছিল বহু আগে থেকেই। ক্রমেই চীন যে বাণিজ্যিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছিল সেটা বুঝতে বিশ্ববাসীর বেশ খানিকটা সময় লেগেছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রও বোধহয় বুঝতে পারেনি যে চীনের বাণিজ্য কৌশল পরমাণু অস্ত্রকেও হার মানাবে। চীনা পণ্য পৃথিবীব্যাপী মানুষের রোজকার জীবনকে এমন আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, যে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া মুশকিল। আপনি যদি চরম চীন বিরোধী হন তবুও লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন না কোন চীনা পণ্য বা প্রযুক্তির সংস্পর্শে আপনাকে আসতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চীনা এই পণ্যের ব্যবহার আরো বেশি। এদিকে বছর দুয়েক আগে থেকে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে সম্পর্কের টানা পোড়ন চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই ইসূতে তিনি অভিযোগ করে আসছেন যে, চীন মার্কিন কোম্পানিগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি করার পাশাপাশি তাদের চীনের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাধ্য করছে। চীন ভর্তুকি ও অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে অনায্যভাবে দেশীয় কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, চীন যেন বাণিজ্যনীতিতে পরিবর্তন আনে। আর দেশটি যেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি পণ্য কিনে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরও অভিযোগ, চীন গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে আমেরিকা থেকে অন্যায়ভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে। প্রতি বছরে চীন আমেরিকা থেকে ৪০ থেকে ৬০ হাজার কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে।

অপরদিকে চীনের অভিযোগ হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সংঘাত শুরু করেছে। এবং চীন এটাও বলে যে, তারা তাদের বাণিজ্য নীতিতে আপাতত কোন পরিবর্তন আনবে না। মূলত একুশ শতকে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে আশংকাগ্রস্থ করে তোলে। ফলে যে কোন ভাবে চীনের এই অগ্রগতিকে রোধ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র মরিয়া হয়ে উঠে এবং তা বাস্তবায়নে চীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের প্রয়াস গ্রহণ করে।

অধিকিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে দোষারোপ করেই ক্ষান্ত হয়নি। চীনের এই বাণিজ্যিক আগ্রাসন রুখে দেবার কার্যকরী পদক্ষেপ হিসেবে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে প্রথম চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে অথচ একই মাসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি পণ্যের উপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। চীনও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের উপর চীনও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। এভাবে দফায় দফায় ভিন্ন ভিন্ন পণ্য আমদানির উপর পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করে একে অপরের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। দুই দেশের মধ্যে এই যখন অবস্থা ঠিক তখনই চীনে হানা দেয় এক নতুন ভাইরাস নাম তার করোনা। এই ভাইরাসের কবল থেকে দুর্বল ও শক্তিশালী কোন রাষ্ট্রই রেহাই পায়নি। এমনকি বাদ যায়নি চীনের প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রও। শুধু তাই নয় করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শীর্ষে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন লকডাউনে থাকার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অবস্থা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। এদিকে চীন করোনার আঁতুড়ঘর হলেও চীনের একটি প্রদেশ বা বলতে গেলে একটি শহর ছাড়া অবশিষ্ট সম্পূর্ণ অংশেই পরিস্থিতি যথেষ্ট স্বাভাবিক ছিলো। আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে চীন যখন লকডাউন থেকে বেরিয়ে এসেছে, বাকি বিশ্বের মত যুক্তরাষ্ট্র তখন লকডাউনের চাদরে ঢাকা পড়েছে। ফলে চীন যখন তার দেশে উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র তখন উৎপাদনের কথা কল্পনা করতেই ভয় পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখন কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বারবার চীনকে কখনো করোনা ছড়িয়ে দেবার জন্য, কখনো আবার মহামারীর তথ্য গোপন করার জন্য দোষারোপ করছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একই সুরে গলা মিলিয়ে ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রই চীনকে দোষারোপ করছে। অবশ্য চীন সেদিকে কর্ণপাত না করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা মোকাবেলার সরঞ্জামাদি থেকে শুরু করে নিজেদের চিকিৎসকদের পাঠাচ্ছে সহায়তার জন্য। এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কিট থেকে শুরু করে করোনা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ম্যাডিকেল ইকুয়েপমেন্ট নিতে বাধ্য হচ্ছে।

ফলে চীন যেসকল রাষ্ট্রের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে করোনাত্তোর কালে চীনের সাথে সেসকল রাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো উন্নত হবার একটা সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। এমনকি এটাও সম্ভব যে, করোনা পরবর্তীকালেও উক্ত দেশগুলোতে চীনের একটি প্রভাব রয়েই যাবে এবং সেখানে চীনা পণ্যের একটি স্থায়ী বাজার তৈরি হবে। যা যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। ফলে চীনের এরূপ উদীয়মান চেহারায় ভীত যুক্তরাষ্ট্র করোনা ইস্যূতে বারবার চীনকে দোষারোপ করে যাচ্ছে। এখান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, উদীয়মান চীনের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই আতংকগ্রস্থ। ফলে দুই দেশের মধ্যে এখন দ্বন্দ্বটা এক প্রকার স্নায়ুযুদ্ধের রূপ নিয়েছে।

কিন্তু উদীয়মান কোন শক্তি বা প্রতিপক্ষকে দেখে আশংকাগ্রস্ত হওয়ার উদাহরণ এটাই কী প্রথম? উত্তর হচ্ছে ‘না’। তাহলে দেখা যাক ইতিহাস কী বলে?

বিশ্বে ‘থুকিডাইডিস তত্ত্ব’ নামক একটি তত্ত্ব চালু আছে; যেখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে একটি রাষ্ট্র বা জাতি অপর কোন রাষ্ট্র বা জাতির উত্থানে শংকিত হয়ে পড়ে।

থুকিডাইডিসকে বিজ্ঞান সম্মত ইতিহাসের জনক বলা হয়। একাধারে তিনি ছিলেন একজন এথেনিয়ান জেনারেল ও ইতিহাসবিদ। ৪৩১ খৃস্টপূর্ব থেকে শুরু করে ৪০৪ খৃস্টপূর্ব পর্যন্ত এক দীর্ঘ যুদ্ধ সংঘটিত হয় তৎকালীন পরাশক্তি স্পার্টা ও উদীয়মান শক্তি এথেন্সের মধ্যে, যার নাম পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ। থুকিডাইডিসকে তদানিন্তন নগর রাষ্ট্র এথেন্সের অধীনস্থ থ্রেস রাজ্যের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের অষ্টম বছরে তিনি স্পার্টানদের আক্রমণের হাত থেকে থ্রেস রক্ষা করতে ব্যর্থ হন। ফলে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। নির্বাসিত জীবনেই তিনি এই বইটি লিখেন। বইয়ের নাম ‘পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের ইতিহাস’। বইটি তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি।

বইটিতে দেখানো হয়েছে, কিভাবে এথেন্সের উদীয়মান শক্তিতে আতংকগ্রস্থ হয়ে স্পার্টা যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়। অন্যদিকে উদীয়মান স্পার্টাও নিজের শক্তি সম্পর্কে কিছুটা অহংকারী ও দাম্ভিক হয়ে ওঠে। তাই দুই পক্ষই যুদ্ধের মঞ্চে মুখোমুখি হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। স্পার্টা বন্ধু প্রতিমদের নিয়ে রাতারাতি গড়ে তোলে পেলোপনেশিয়ান লীগ। অপরদিকে এথেন্স থেকে মোকাবেলা করতে বন্ধুরাষ্ট্র ও পার্শ্ববর্তী ছোট দ্বীপগুলো মিলিয়ে তৈরী করেছিল দানিয়েল লীগ। অথচ অল্পকাল এই পেলোপনেশিয়ান লীগ আর দানিয়েল লীগ একত্র হয়ে কয়েক বছর আগেই পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এতে এই প্রমাণিত হয় যে, বিশ্ব রাজনীতিতে গতকালের বন্ধু বলে কিছু নেই। আবার শত্রু হওয়াটাও সময়ের ব্যপার মাত্র।

আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের সেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির ধারার মূলত কোন পরিবর্তন নেই। চীন-মার্কিন বাণিজ্য দ্বন্দ্ব যেন তারই ধারাবাহিক রূপের প্রতিফলন। ইতিহাসে এরকম আরও ঘটনা আছে যার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্যনীয়। এজন্য এখনও কোন উদীয়মান শক্তি প্রতিষ্ঠিত কোন শক্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠলে তাকে বলা হয় ‘থুকিডাইডিসের ফাঁদ’। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব এখানেই শেষ নয়।

যেমন, আঠারো শতকের কথাই ধরা যাক, যখন ফ্রান্স আর ব্রিটেন ছিল দুই পরাশক্তি। সেই সময় সম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে এই দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠে। অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব নিয়ে সূচিত সপ্তবর্ষব্যাপী (১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ) যুদ্ধের ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই দুই মোড়লের মধ্যে একই সময়ে তিন মহাদেশে যুদ্ধ চলেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংগ-ফরাসি দ্বন্দ্ব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে মীর কাসিমের বক্সারের যুদ্ধের পেছনে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের একটা বড় প্রভাব ছিল। তবে এই সংঘাতের পারদ সর্বোচ্চ উচ্চতায় ওঠে নেপোলিয়নের আমলে। ইউরোপে বছরের পর বছর যুদ্ধ বেধে ছিল। আর শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়নকে থামাতে বিভিন্ন শক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয় কোয়ালিশন।

এরপর আসি আরেক পর্যায়ে, ব্রিটিশদের কাছ থেকে প্রথম স্বাধীন হওয়া কলোনি যুক্তরাষ্ট্র উদীয়মান পরাশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। ভয়াবহ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে দেশটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসাবে বিশ্ব নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তীতে দেখা যায়, মার্কিনিদের এই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্মুখে চলে আসে তার সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ দিয়ে। শুরু হয় স্নায়ু যুদ্ধ। তবে এ যুদ্ধ দুদেশের নাগরিকের প্রাণ না কাড়লেও, তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশ, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান এই পরাশক্তির লড়াইয়ের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে। এই স্নায়ুযুদ্ধের উদ্ভব হয় কিভাবে সেটাই এখন আলোচ্য বিষয়।

অতীতে যা ই হয়ে ঘটুক, বিশ্বব্যাপী স্ব-স্ব রাষ্ট্র বা জাতির আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতার বিশ্বায়ন শুরু হয় পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে ইউরোপীয় জাতিসমূহের বিভিন্ন জলপথ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে একে একে ইউরোপীয়দের আগমন দেখেই সেটা সহজে অনুমান করা যায়। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা প্রকট আকার ধারণ করে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে। কৃষি বিপ্লবের ফল উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য ও পর্যাপ্ত কাঁচামাল এবং বাষ্পীয় ইঞ্জিনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে ইংল্যান্ডে শিল্পপণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে ব্যপক পরিবর্তন আসে সেটাই শিল্প বিপ্লব। ইংল্যান্ডে যে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল তা অদ্যাবধি চলমান। বর্তমান বিশ্ব শিল্প বিপ্লবের চতুর্থ পর্যায় অতিক্রম করছে।

যা হোক ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হলেও ক্রমেই তা ইউরোপের অপরাপর রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্প বিপ্লব উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যপক পরিবর্তন নিয়ে আসে অর্থাৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সাথে কারখানা ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর আস্তে আস্তে পুঁজিবাদী অর্থনীতির সূচনা হয়। ব্যাপকভাবে শিল্প পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় এসকল শিল্প পণ্য বিক্রির জন্য ইউরোপের বাইরে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিজস্ব বাজার সৃষ্টি করা ছিল সময়ের দাবী। যে কারণে ইউরোপীয় জাতিসমূহ ইউরোপের বাইরে আফ্রিকা, এশিয়া এমনকি আমেরিকায় নিজস্ব উপনিবেশ স্থাপনে মরিয়া হয়ে উঠে। নৌশক্তিতে শক্তিশালী হওয়ার কারণে প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে শীর্ষ স্থান দখল করে নেয় বৃটিশরা। ইউরোপীয় রাষ্ট্রেগুলোর মধ্যে জার্মানিতে শিল্প বিপ্লব অপেক্ষাকৃত দেরিতে সূচিত হয়। ফলে উপনিবেশ বিস্তারের দৌড়ে অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের তুলনায় জার্মানি বলতে গেলে একেবারেই পিছিয়ে পড়ে। বিংশ শতকের শুরুতে সমকালীন জার্মান অর্থনীতিবিদরা এরকম একটি তত্ত্ব প্রদান করে যে, “জার্মানি যদি এখনই উপনিবেশ বিস্তারে সচেষ্ট না হয় তাহলে বিশ্বে দখল হয়ে যাওয়ার পরও যে কয়টি স্থান উপনিবেশ স্থাপনের মত অবশিষ্ট আছে সেটাও হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং জার্মানি তার উৎপাদিত বিশাল পরিমাণ শিল্পপণ্য বিক্রির কোন সুযোগ পাবে না”। উল্লেখ্য যে, জার্মানিতে শিল্প বিপ্লব দেরিতে সংঘটিত হলেও শিল্পক্ষেত্রে অতিদ্রুত তারা উন্নতি করেছিল। ফলে উৎপাদিত শিল্পপণ্য বিক্রির জন্য বাজার তৈরি করা সত্যিই প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজনীয়তা এবং জার্মান অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম উপনিবেশ বিস্তারের জন্য একটা সুযোগ খুঁজতে থাকলেন। এ জন্য ঊনবিংশ শতকের শেষদিক থেকেই জার্মানি নিজেদের বাণিজ্যিক স্থায়ী বাজার সৃষ্টিতে মরিয়া হয়ে উঠে। এক্ষেত্রে ইউরোপে অন্যান্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি ইংল্যান্ডই ছিল জার্মানির জন্য উপনিবেশ বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান বাধা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইংল্যান্ড আর জার্মানির সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। আর জার্মানি একটি গোলযোগ বাধার অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে। এরই মধ্যে সুযোগ এসেও যায়।

অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফার্ডিন্যান্ডের হত্যাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আস্ট্রো-সার্ব দ্বন্দের সুযোগে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের উদ্দ্যেশ্যে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম অস্ট্রিয়াকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে ইন্ধন যোগায়। অস্ট্রিয়াও বলতে গেলে জার্মানির এই ফাঁদে পা দেয়। সার্বিয়ার বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়ার যুদ্ধ ঘোষণা করলে এই সুযোগে জার্মানির রাজা দ্বিতীয় উইলিয়াম প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে বসলেন, উদ্দেশ্য এই ফাঁকে নিজেদের উপনিবেশ বিস্তার। চার বছরব্যাপী চলা এই যুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হয়। এবং প্রতিপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী বাধ্য হয়ে জার্মানিকে অপমানজনক ভার্সাই সন্ধি মেনে নিতে হয়। ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির কাছ থেকে যে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছিল তা জয়ী রাষ্ট্রেগুলোর যুদ্ধে করা খরচের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল ছিল। সে কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বলতে গেলে জয়ী রাষ্ট্রগুলোর তেমন কোন লাভই হয়নি, একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রচুর অস্ত্র বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে মোটাতাজা হয়ে উঠে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইংল্যান্ডের কাছে বিশাল অংকের অর্থনৈতিক ঋণের জালে আবদ্ধ ছিল, সেখানে যুদ্ধ চলাকালে ইংল্যান্ডের কাছে অস্ত্র বিক্রির দরুন সেই ঋণ শোধ করে আরও বিশাল অংকের টাকা ঘরে তুলেছিল। ফলে যুদ্ধোত্তরকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠে এবং ইউরোপের বাইরে প্রথম কোন রাষ্ট্র নতুন বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঠিক একই সময়ে অর্থাৎ যুদ্ধকালীন সময়ে, বলতে গেলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বেই রাশিয়ায় ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বলশেভিক বিপ্লবের ফলে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সূচনা হয় এবং বিশ্ববাসী নতুন এক শাসনব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়। বলশেভিক বিপ্লব অতিবাহিত হওয়ার অল্পকাল পরেই রাশিয়া একটি ইউনিয়ন গঠন করে; যার নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। গঠিত এই ইউনিয়নের ভৌগোলিক সীমানা এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, তা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎশক্তিতে পরিণত হয় নিঃসন্দেহে। সুতরাং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অতিক্রান্ত হওয়ার পর বিশ্বে দুটি নতুন বিশ্বশক্তির উত্থান ঘটে

১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ২) সোভিয়েত ইউনিয়ন।

উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ দুই বিশ্বশক্তিকে আমরা স্নায়ুযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দেখবো। অথচ এ রাষ্ট্রদ্বয়ই কিনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একই শিবিরে থেকে যথাক্রমে ত্রিশক্তি জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।

ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির ভৌগোলিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর এত বেপরোয়াভাবে ছুরি-কাঁচি চালানো হয় যে, জার্মানি একটা পংগু রাষ্ট্রে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় অবতীর্ণ হওয়ার পর জার্মানিতে একটি রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। টালমাটাল জার্মানি তখন ভার্সাই সন্ধির দুষ্ট চক্রে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছে। এ অবস্থায় জার্মানির রাজনৈতিক রংগমঞ্চে আবির্ভূত হন এডলফ হিটলার। তিনি যুদ্ধ বিধ্বস্ত জার্মানির নাগরিকদের নিজেদের জাতিগত বিশুদ্ধতা উপলব্ধি করার পাশাপাশি ভার্সাই সন্ধির বিরোধিতা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে অচিরেই ভার্সাই সন্ধির শর্তসমূহ ভংগ করার জন্য সরকারের নিকট আবেদন জানান। অসাধারণ বাগ্মীতার কারণে হিটলার তরুন প্রজন্মের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে তার নাৎসি পার্টি ও সহযোগী ব্রাউন শার্ট বাহিনীর সহায়তায় ১৯৩৩ সালের নির্বাচনে কারসাজি মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসেই তিনি ভার্সাই সন্ধির শর্তসমূহ একে একে লংঘন করতে শুরু করেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয়ী ইউরোপের কোন বৃহৎ শক্তির দ্বারা তেমনভাবে বাধাপ্রাপ্ত না হওয়ায় একপর্যায়ে আগ্রাসী হয়ে উঠেন। এক পর্যায়ে কোনরকম উস্কানি ছাড়াই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত ভয়ংকর এক যুদ্ধে জার্মানিকে ঠেল দেন। পরবর্তী ছয় বছর ধরে এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়। যুদ্ধে জার্মানির প্রতিপক্ষ শিবিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একতাবদ্ধভাবে ইংল্যান্ডের সাথে মিত্রপক্ষে যোগদান করে জার্মানির আগ্রাসন ঠেকিয়ে দেয়। জার্মানির অগ্রগতি রোধ করার ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকাই ছিল মূখ্য। অন্যদিকে জার্মানির আরেক দোসর সমকালীন এশিয়ার নব উদীয়মান শক্তি জাপানের উপর পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের মধ্যে দিয়ে অক্ষশক্তির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উদীয়মান দুই বৃহৎশক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে বিশ্বের দুই পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর এই দুই পরাশক্তি বিশ্বব্যাপী নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠে। একই শিবিরের এই দুই শক্তি এবার একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়। শুরু হয় তৃতীয় কোন পক্ষকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব তাড়িত এক ঠান্ডা লড়াই। যা ইতিহাসে স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রায় পাঁচ দশকের কম আর চার দশকের বেশি সময় জুড়ে এই স্নায়ুযুদ্ধ পৃথিবীকে দুটি বলয়ে বিভক্ত করে রেখেছিল। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদের আদর্শ ধারণ করে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রকে নিয়ে একটি বলয় তৈরী করে এবং অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বাণী ছড়িয়ে দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রসমুহকে নিয়ে আরেকটা বলয় তৈরী করে। এরই মধ্যে সদ্য প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ কিছু কিছু ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালন করাই যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয় বটে, তবে দু’দেশের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক একটা লড়াই চলতেই থাকে। মূলত দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান এই অঘোষিত অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক ঠান্ডা লড়াইকে স্নায়ুযুদ্ধ বলা হয়। যার অবসান ঘটে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের মধ্য দিয়ে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে বিশ্বে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যেই এই দুই রাষ্ট্র একে অপরের সাথে একটি অঘোষিত দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল।

সুতরাং মোটা দাগে যা বোঝা গেল তাতে এটা স্পষ্ট যে, যুগ যুগ ধরেই ক্ষমতা ধরে রাখার এই প্রবণতা চলে আসছে। যেমন প্রাচীন গ্রিক সাম্রাজ্যে এথেন্স যেমন স্পার্টার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্স আর ব্রিটেন দুই পরাশক্তির সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে যেমন দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠেছিল, তেমনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে জার্মানি ব্রিটেনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। আবার বিংশ শতাব্দীতে মার্কিন-সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধ যেমন তুঙ্গে উঠেছিল; ঠিক তেমনি একবিংশ শতকে চীনও এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আর যা ই হোক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বা প্রতিপক্ষের উত্থানকে রদ করতে এযুগে কোন রাষ্ট্রই আর অতীতের ন্যায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে বলে আমি মনে করিনা। আজকের দিনের দ্বন্দ্বটা হবে গত শতাব্দীর স্নায়ুযুদ্ধের ন্যায়। করোনা ইস্যুতে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার সম্পর্কও আস্তে আস্তে ঠিক সেই দিকেই মোড় নিচ্ছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার আশঙ্কা এই যে, ওয়াশিংটন ও বেইজিং ইতিহাসে দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ নামক খাদের কিনারে অবস্থান করছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here