সময় এখন তেলাপোকা হবার

0



মো: সফর আলী
প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ
রাজশাহী সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ।
মানুষের ‘জীবন’ ও ‘অর্থনীতি’ এ দুটো বিষয় সবসময় একে অপরের পরিপূরক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এদের একটির ভাগ্য অপরটির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বলি, আসলে মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়েই অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। আর গতিশীল অর্থনীতি মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। এমনকি মানুষের সংকটকালীন সময়ে অর্থনীতিই মানুষের নিকট ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। যুগ যুগ ধরে পৃথিবী নামক গ্রহে এ এক অমোঘ নিয়মনীতিতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে মানুষের সংশ্লিষ্টতার অভাবে অর্থনীতির চাকা ক্রমেই শ্লথ হতে হতে তা থেমে যেতেও পারে; যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য হুমকিস্বরূপ। করোনাকালে এসে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। করোনার প্রকোপে একের পর এক দেশ বিভিন্ন সময়ে লকডাউনে গিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশেও লকডাউনের আদলে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যা এখনো চলমান। কিন্তু লকডাউন থেরাপি করোনা সংক্রমণে কিছুটা বাধ সাধলেও তা অর্থনীতির চাকাকে পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোও এখন করোনার কারণে লকডাউন নামক দুষ্ট চক্রের কবলে পড়ে মুমূর্ষু রোগীর ন্যায় ধুকছে। অন্যদিকে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি বলতে গেলে করোনা আক্রান্ত রোগীর ন্যায় লাইফ সাপোর্টে আছে।

মূলতঃ এই মূহুর্তে মানুষের জীবন ও অর্থনীতি একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছে বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। কেননা মানুষকে করোনা সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যে সাধারণ ছুটি বা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে, তা দিনকে দিন জগদ্দল পাথরের মত জনজীবনের বুকের উপর চেপে বসেছে। লকডাউন যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে ততই খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষদের জন্য এই পাথর ক্রমশ আরও ভারী হয়ে উঠছে। অন্যদিকে আমাদের দেশের জনসংখ্যার যে ঘনত্ব এবং সচেতনতার যতটা অভাব, তাতে লকডাউন তুলে দিলে সংক্রমণ যে দ্রুত বিস্তার লাভ করবে সেটা সহজেই অনুমেয়।

ঠিক এই অবস্থায় এসে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। অর্থনীতিকে বাঁচাতে গেলে লকডাউন তুলে দিতে হবে। কিন্তু এতে করে জনজীবন হুমকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জনজীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে লকডাউন অব্যাহত রাখলে অর্থনীতির চাকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বিষয়টির সরল ব্যাখ্যা এই যে, জীবন বাঁচাতে গেলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাচ্ছে আর অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে গেলে জীবন হুমকির মধ্যে পড়ছে। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় আমাদের দেশও এখন উভমুখী এক সমস্যার গ্যাঁড়াকলে পড়েছে।

অন্যদিকে যে প্রত্যাশা নিয়ে বিভিন্ন দেশ লকডাউন দীর্ঘায়িত করে যাচ্ছিলো সে আশাও এখন তিরোহিত হয়েছে। বিশ্ববাসী মনে করেছিল লকডাউন থাকতে থাকতে এরই মধ্যে হয়তো করোনার ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ইতঃপূর্বে বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি ভ্যাক্সিনের পরীক্ষা ব্যার্থ হয়েছে। অন্যগুলোও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে রয়েছে। আবার এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অত্যন্ত হতাশার সুরে বলেছে যে, করোনার ভ্যাক্সিন আর হয়তো কোনদিনই পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আশাবাদী হতে দোষ নেই, তাই ভ্যাক্সিনের আবিষ্কার নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে আশাবাদী। নিশ্চয় খুব দ্রুতই এই ভ্যাক্সিন তৈরি হবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ভ্যাক্সিন তৈরি হলেও কী খুব দ্রুত করোনা সমস্যার সমাধান হবে? বিভিন্ন দেশের গবেষণার মাধ্যমে আমরা জেনেছি যে, করোনা ভাইরাস মিউটেশনের মাধ্যমে এর জীনগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম। যেমন বাংলাদেশে চাইল্ড হেলথ কেয়ার অর্গানাইজেশন যে ভাইরাসটির জেনোম সিকুয়েন্স করেছে, সেটি ইতোমধ্যে ৯ বার মিউটেশন করে ফেলেছে। এখান থেকে একটি বিষয় ধারণা করা সম্ভব যে, যদি করোনা ভাইরাসের সাধারণ কোন বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে ভ্যাক্সিন না তৈরি করা হয়, তাহলে একই ভ্যাক্সিন দিয়ে সকল করোনা রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব হবে না। আবার ভ্যাক্সিন যদি আবিষ্কৃত হয়েও যায় তবু আমাদের মত সাধারণ মানুষের হাতে তা পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।

এখন ভাবনার বিষয় হলো এই যে, মাত্র কয়েক মাসের লকডাউনের ফলেই বিশ্বব্যাপী জনজীবনে যেভাবে স্থবিরতা নেমে এসেছে, তাতে ভবিষ্যতে এই লকডাউন দীর্ঘায়িত করা কোনভাবেই সমীচীন নয়, সম্ভবও নয়। তাই ভ্যাক্সিন এখন আসুক আর পরেই আসুক বা একেবারেই না আসুক সেটার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে এই মুহুর্তে অর্থনীতির চাকাকে সচল করা। সেক্ষেত্রে প্রধান ও একমাত্র উপায় হচ্ছে জনসাধারণের কাজে যোগদান করা। আরে কাজে যোগদান মানেই হচ্ছে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। কিন্তু সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি যতই থাকুক না কেন এই মুহুর্তে অর্থনীতিকে সচল করতে না পারলে করোনার চেয়ে বেশি মানুষ মারা যাবে হয়তো না খেয়ে। সুতরাং কাজে যোগদান করা ভিন্ন আমাদের সামনে আর বিকল্প কোন রাস্তা নেই। কিন্তু করোনাময় পরিবেশে কাজ করতে হলে কাজে নামার আগে আমাদেরকে নূন্যতম কিছু প্রস্তুতি সেরে নেয়া আবশ্যক।

পৃথিবীতে যুগে-যুগে কালে-কালে খাদ্য সংকটসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীজনিত সৃষ্ট সমস্যায় পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীকুলের সাথে সাথে মানুষও নিজেদেরকে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এই খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অভিযোজন’।পরিবেশের সাথে সুষ্ঠুভাবে মানিয়ে চলার জন্য জীবের গঠন ও কাজের যেকোন পরিবর্তনকে অভিযোজনে বলে। এ প্রক্রিয়ায় জীবের শরীরবৃত্তীয়, গঠনগত ও আচরণগত যে পরিবর্তন হয় তা নির্দিষ্ট পরিবেশে জীবকে টিকে থাকতে সাহায্যে করে। মোদ্দা কথা পরিবেশ অনুযায়ী নিজেকে পরিবেশের উপযোগী করে গড়ে তোলা, যাতে করে বৈরী পরিবেশেও টিকে থাকা যায়; এমন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে অভিযোজন।

এই অভিযোজন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়ার সঠিক সময় এখনই। যদি সময়ের এই দাবীকে অস্বীকার করা হয়, তাহলে বিষয়টি ডাইনোসর আর তেলাপোকার মতো হতে পারে। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে তথা অভিযোজিত হতে না পেরে ডাইনোসর কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে।

অন্যদিকে সমসাময়িক সময়ের আরেক প্রাণী তেলাপোকা অভিযোজন প্রক্রিয়া সফলভাবে রপ্ত করে আজও স্বাড়ম্বরে টিকে আছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই অভিযোজন হয়তো অন্যান্য প্রাণীদের থেকে আলাদা হবে। যেমন মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার পূর্বশর্তই হবে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের মাধ্যমে, সঠিক খাদ্যাভাস গড়ে তোলা এবং মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি শরীরচর্চার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ টিকে থাকতে হলে আমাকে-আপনাকে তথা মানবজাতিকে যত দ্রুত সম্ভব এ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে হবে।

এ অবস্থায় আসুন তেলাপোকার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজদেরকে অভিযোজিত করার জন্য মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি আজ থেকেই নিতে শুরু করি। আর টিকে থাকার দৌড়ে এ যাত্রায় নিজদেরকে যোগ্য প্রতিযোগী হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হই।

শরৎচন্দ্রের কোন এক রচনায় পড়েছিলাম, “অতিকায় হস্তী বিলুপ্ত হইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে”।

এখন সিদ্ধান্ত আপনার, ডাইনোসরদের মত হারিয়ে যাবেন, নাকি তেলাপোকার কাছ থেকে অভিযোজনের শিক্ষা নিয়ে টিকে থাকবেন?

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here